বুধবার, ১ মে, ২০১৩

অন্যমনস্ক ও রূপবান্ : শব্দের অন্য উঠোন


অন্যমনস্ক ও রূপবান্  : শব্দের অন্য উঠোন


                                আমাদের সকলেরই এরকম হয় মাঝে মাঝে। এটা সেটা কত কী না ভিড় করে আসে মনে।  ভিড়ে ঠাসা বাস।জানালার ধারে বসে তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে। কত কী যে মনে আসছে চলেও যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে দৃশ্য, ভেঙে যাচ্ছে। সাজাতে পারছি না কিছুতেই। হঠাত খেয়াল হল সিঁথির মোড় পেরিয়ে যাচ্ছি। কোনোরকমে নেমে পড়ি। সাময়িক বিস্মৃত হই এই কোলাহলে ভরা যাপনের জগতটা। কিন্তু তারক মাঝে মধ্যে নয় প্রায়সময়ই হারিয়ে যাচ্ছে। স্ত্রী কত কী বলছে,চায়ের দোকানের বন্ধু, অফিসের জরুরি উপদেশ সব ছাপিয়ে তারক সেঁধিয়ে যায় অন্য একজগতে।

                    সমস্যাটা সেখানেই। তারক কি শুনতে পায় না? নাকি চায় না? মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে। বাবা,বউ নিয়ে তার পরিবার। স্বাভাবিক ভাবেই প্রেমময়ী(নাকি স্নেহময়ী!) বউ এবং অন্যান্যরাও অদ্ভুত এই ছেলেকে নিয়ে চিন্তিত। অথচ তারকের দাবি শব্দ নিয়েই তার কাজ। আর সে শুনতে পাবে না!! হ্যাঁ, তারক ফোলিও আর্টিস্ট। অনেকগুলি ছবিতে সে ফোলিওর কাজ করেছে।পায়রা ওড়ার শব্দ পাতার ঝটপটানিতে,মুড়ির কৌটো নাড়িয়ে টয় ট্রেন, নখে নখে বোতাম আটকানো ,কাগজ মচমচিয়ে হাতের ভিতর আগুন জ্বেলে ফেলে সে।




বন্ধু, সহকর্মী দিব্যেন্দু তারকের জন্যে একজন সাইকিয়াটিস্ট ঠিক করে, স্বাতী। যাবতীয় পরিক্ষার রিপোর্টে দেখা গেল তারক পাশ। তার কানে কোন সমস্যা নেই। তাহলে ?

        এই জিজ্ঞাসা চিহ্নটাই আসলে ছবিটির বিষয়। পরিচালক যার ওপর গুরুত্ব দিলেন- একজন ফোলিও আর্টিস্টের নিজস্ব জগত আর আমাদের দৃশ্যমান জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে তারক। স্বাতী একবার  প্রশ্নটি তুলেছে তার স্যার ডঃ সেনের কাছে ঃ আমরা যা বলছি তা শোনার সত্যি কি কোনো প্রয়োজন আছে তারকের? নাকি শব্দের সেই নূতন জগতটাই ভাল,যা তারকের নিজস্ব তৈরি!!

              হঠাত জীবনানন্দের কথা মনে পড়ে যাবে কি? নিজস্ব জগতের সেই বাসিন্দাটি, যিনি অদ্ভুত আঁধার পেরিয়ে এই শহরের ট্রামের তলায় চলে গেছিলেন।মগ্ন তারক বিশ্বাসই করতে চায় না তার অসুখের কথা। চাকরি হারিয়েও যে কিনা বাড়ি বসে চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে গিয়েখেয়াল করে তার কাজে ভুল রয়ে গেছে। ধীরেধীরে খালি হতে থাকা কাপ টেবিলে রাখার সূক্ষ্ম শব্দনূতন করে আবিষ্কার করে সে।

             গভীর রাতে ঘুম ভেঙে উঠে ফ্যান,দেওয়াল ঘড়ি বন্ধ করে সে কি শব্দ বন্ধ করে দিতে চায়?কিন্তু জীবন?তার অনুরণন!!সে শুনেছে কারুর কাছে, শব্দ নাকি ব্রহ্ম।

      বন্ধু দিব্যেন্দু, ডঃ স্বাতি আর তারকের স্ত্রী রত্না কিভাবে স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনল তারককেসেটা পরিচালকের মুনশিয়ানা। আশাবাদী পরিচালক তা ভাল ভাবেই দেখিয়েছেন। ছবির আড়ালে থাকা শ্রম এবং শিল্পির দাম যে কত ন্যূন তা উঠে আসে সংলাপেই। যে মাইক্রোফোন তারক রাগের মাথায় ভেঙে ফেলে,দশ বারোটি ফোলিও করেও তার দাম উঠবে না। শিউরে উঠি!! জীবনানন্দ গভীর রাতে সব্বাই ঘুমিয়ে পড়ার পর পেন্সিলে খসখস করে লিখতেন সেইসব ছাইভস্ম! নিঝুম রাত্রে হেঁটে চলা মাতালের পদক্ষেপ অনুসরণ করছে তারক। সৃষ্টি করছে শব্দে'র অন্যতম দৃশ্য...... 
                                             
                                          লেখাঃ ঊষশী কাজলী  


 পরিচালকঃ কৌশিক গাঙ্গুলি

প্রযোজকঃ গৌতম কুণ্ডু
সিনেমাতগ্রাফিঃ শীর্ষ রায়।
অভিনয়ঃ ঋত্বিক চক্রবর্তী , রাইমা সেন , চুর্নী গাঙ্গুলি প্রমুখ।




বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

বাইসাইকেল কিকঃ এক ইছেপূরনের গল্প।


 
 
এক ঝাঁক ইচ্ছেরা কড় গুনে গুনে স্বপ্ন দেখে। ভবিষ্যতের রংমশাল নিজেরাই মনের মধ্যে জ্বালায়। কখনও সেই রঙিন আলো নিভে গেলে ম্যাজিশিয়ানের আবির্ভাব হয়, আর তার রুপোকাঠির ছোঁয়ায় রাস্তারা আবার আস্তানা খুঁজে পায়।

ঠিক এইভাবেই স্বপ্ন দেখত রুবায়েত। তার ইশারায় জীবন চলবে, তিন কাঠির বেড়াজালে বল গিয়ে আছড়ে পড়বে বারবার। আর এই ভাবেই বহুদিন আগে স্বপ্ন দেখত মতিদা। দুটো স্বপ্ন এক, দুটো ইচ্ছে এক, শুধু সময়টা আলাদা, আলাদা প্রেক্ষিত, তাই ইচ্ছেপূরনের গল্পটা আর এক থাকে না, সময়ের সাথে সাথে সেটাও বদলে যায়, আর বদলে যায় বলেই দুটো স্বপ্ন এক হয়ে যায়, দুটো ইচ্ছে এক হয়ে যায়, দুটো মন এক হয়ে যায়, ফারাক শুধু একটাই একটা মনে আর একটা মনের প্রবেশ ঘটে। বহুবছর আগে হারিয়ে যাওয়া ইচ্ছেরা, মানুষটা আবার খুঁজে পায় এই তরুণ উচ্ছ্ব্ল বালকটির মধ্যে। স্বাধীন ভাবে তাই স্বপ্নরা বেঁচে থাকে, স্বাধীন ভাবে তাই পোশাক পড়ে নেমে পড়তে হয় ময়দানে, সবুজ ঘাসগুলো সাদরে আহ্বান জানায়। “বাই সাইকেল কিক”, দেবাশিস সেনশর্মা ও সুমিত দাস পরিচালিত নতুন বাংলা ছবি ঠিক এই স্বপ্নের গল্প, এই ইচ্ছের গল্প।

সত্যিই তো যদি ইচ্ছেডানায় ভর করে পক্ষীরাজ তাহলে তো ডানা মেলে উড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই তো রুবায়েত এর জোরালো শট তিনকাঠি পেরিয়ে বেড়াজালে বন্দি হয়, আর তখনই পায়রাগুলো আবার ঘরে ফেরার তাগিদে সবাই একসঙ্গে উড়ে যায়, উড়ে যায় মন, উড়ে যায় ভালবাসা, উড়ে যায় বহুদিনের জমে থাকা ইচ্ছেরা।

বাংলা সিনেমা তার বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কখনও উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে বা কখনও কোন গ্রামবাংলার লালমাটিতে ঘুরে বেরায়। দৃষ্টিকোণে জমা হতে থাকে আমার শহর, আমার বাংলার পুঞ্জিভূত স্রোত। স্বাধীন চিত্রপরিচালকদের কাছে সমস্যা ঠিক এইখানেই, সীমিত বাজেটে ছবি বানানো। যেখানে অনেক ইচ্ছে অধরাই থেকে যায়। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে গল্প পরিবেশক দর্শক মনে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে, বাই সাইকেল কিক তার উদাহরণ।

শুধুমাত্র ঝাঁ চকচকে লোকেশন, আর দামি অভিনেতা অভিনেত্রী ছাড়াও যে, গল্পের জোড়ে, সংলাপের জোড়ে, দৃশ্যগ্রহণের জোড়ে, সম্পাদনার জোড়ে সর্বোপরি পরিচালনার জোড়ে ছবির অধিকাংশ তাত্ত্বিকতাকে মেনে, ছবিকে সম্পুর্ন আলাদা একটা মাধ্যম হিসাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ইঙ্গিত, ও তদপরি নিজের প্রয়াসের ছাপ রেখে যাওয়ার ব্যবহার বাংলা ছবিতে নতুন একটা দিগন্তের উন্মোচন করে। যেখানে থিওরি আর টেকনিক মিলে যায়।

কবিতা কখনও ছবির ভাষা হতে পারে, কবিতার তো স্বকীয়তা আছে, তবু কেন সে ছবির ভাষা হবে, ছবির তো নিজস্ব ভাষাই আছে, যা নিয়ে সেই প্রাচীন যুগ থেকে তর্ক চলেই আসছে। কিন্তু একটা ছবিতে যদি কোন দৃশ্যকাব্য রচনা হয়, যদি আমি সংলাপের বদলে কবিতা দিয়ে প্রেমের ছবি আঁকি তাহলে? তাহলে আমি একটা ছবির মধ্যে দিয়ে একটা কবিতা বলতে পারি। দুটো মাধ্যম সম্পুর্ন আলাদা হয়েও মিশে যেতে পারে একে ওপরের সাথে। তাই তো ছবির মধ্যগগনে ক্যামেরা যখন প্রবেশ করে শহরের আনাচ-কানাচ থেকে সবুজ বাংলার এবড়োখেবড়ো মেঠো পথে, তখন তার রূপ কবিতা হয়ে ঝড়ে পড়ে পর্দার ওপরে।

বাস্তব জীবনে রুপকথার পরি আসে, তার কানেকানেও জোনাকি গুনগুন করে, ভালবাসা ফুচকার জল পেরিয়ে পারি দেয় জীবন দেখানোর ছন্দে। যেখানে রাজকন্যা এলচুলে মাতোয়ারা হলে সন্ধ্যে ঘনিয়ে বৃষ্টি নামে। শহরের বুক থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ে ভালোবাসার গন্ধ মাখা জল। আর মাধবীলতা যখন অতুলপ্রসাদের সুর তোলে তখন ঘরময় এক নিস্তব্ধতা প্রবেশ করে যা চেনা মুখগুলোকে খানিক্ষনের জন্যেও ভাবের জগতে প্রবেশ করায়।

নতুন ভাবে নতুন আঙ্গিকের কথা যদি বলতেই হয় তা হল এই ছবির দৃশ্য, প্রচণ্ড রঙিন অবায়ব, চারপাশের পরিবেশও যেন রঙ মেখে অপেক্ষা করছে ফ্রেমে উপস্থিত চরিত্রদের সাথে। ছবির দৃশ্যের সাথে সাথে ছবির সম্পাদনাও নতুন মাত্রা যোগ করে। একটা দৃশ্যের পর অপর একটা দৃশ্য ব্যবহার ও সেই সাথে ক্যামেরার ব্যবহার, তার স্থানবদলের  প্রয়োগ রীতি যেন প্রতিটা ফ্রেমকে দৃশ্যবহুল ও অর্থবহ করে তুলেছে। এছাড়াও ছবিতে ব্যবহৃত স্থায়ী ও অস্থায়ী উপাদান যা এক একটা ফ্রেমের অর্থকে আরও গাড় করে প্রকাশ করে। এর প্রমান মেলে খুব ভালভাবে রাশিয়ান পুতুলের ব্যবহারিকতায়। মনের মধ্যে মন, অন্যমন, অন্যমনস্কতার সিম্বোলিক পরিচয়।

ছবির চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে প্রথমেই নজর কাড়ে, টেনিদা ও তার পালের ব্যবহার। যারা আজও ওই উত্তর কলকাতার রক গুলোকে জমিয়ে রাখে, আর কেউ বিপদে পড়লেই চিৎকার করে বলে ওঠে, ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফেলিস......... ইয়াক...ইয়াক। এছাড়া আর যার কথা না বললে লেখাটাই অধরা থেকে যায় সে হল মতিদার চরিত্রে অভিনয় করা ঋত্বিক। তার কেরিয়ারে নবতম সংযোজন এই চরিত্র। যা এককথায় অনবদ্য। তাই বাধ্য হয়েই মনে থেকে যায় পর্দায় তার উপস্থিতি, ইচ্ছের সাথে এগিয়ে চলার ইচ্ছেপ্রসন।

পরিশেষে বলতেই হয় ছবির সঙ্গীত ও আবহসঙ্গীতের কথা। গানের কথা আর দৃশ্যের পিছনে ব্যবহৃত আবহসঙ্গীত ছবিকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়, তাই পরতে পরতে যখন এক একটা দৃশ্যের পিছনে শব্দের বা সঙ্গীতের ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটে তখন সেই দৃশ্যের মাহাত্ম্য অনেকটা গূঢ় হয়, চোখের সাথে সাথে কানেও উপলব্ধ হয়। তাই চোখ বুজেও মাঝে মাঝে সেই সুগন্ধটা পাওয়া যায়।

বাইসাইকেল কিক এক নবতম উদ্যোগ বাংলা ছবির জগতে, এক ইচ্ছেপ্রসনের স্বাধীনতা, মাধবীলতা, আর রুবায়েতের গল্প, মতিদার স্বপ্নপূরণের হাতছানি, সিধু জ্যাঠার দাবার চাল, পটলডাঙার অস্তিত্ব, ফুটবল থেকে বল গরিয়ে গোল আর ম্যাজিশিয়ানের রূপোকাঠির ছোঁয়ায় বাস্তবতা আর রূপকথার মেলবন্ধন, এসবের সংকলন।
(সম্পাদনাঃ অনুসুয়া চন্দ্র)

ছবিঃ বাইসাইকেল কিক

অভিনয়ঃ সৌরভ, রিধিমা, ঋত্বিক, সৌমিত্র চ্যাটার্জি প্রমুখ।

সঙ্গীতঃ জয় সরকার।

আবহসঙ্গীতঃ মৈনাক বাম্পি নাগ চৌধুরী।

পরিচালনাঃ দেবাশিস সেনশর্মা ও সুমিত দাস।     

সোমবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

অবিরত, চলন্ত সাইকেল আর জীবন।


 
 
 
ঠিক ২৫ বছর আগে যখন আফগানিস্থানের থেকে রাশিয়া ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে তখন আর এক লড়াই এর কথা বলছেন ইরানীয়ান পরিচালক মহাসিন মাখমাল বাফ “সাইকিলিস্ট” এর মাধ্যমে। একজন আফগান রিফিউজিকে নিয়ে কিভাবে যেন একটা লড়াই আজও ছড়িয়ে দিচ্ছেন আমাদের মত মানুষদের মধ্যে।

নাসিম এর অসুস্থ স্ত্রীকে সুস্থ করবার জন্য টাকা প্রয়োজন । এই টাকা জোগাড় করতে নাসিম কে সারা শহর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে । ততদিনে নাসিমের কুয়ো খোঁড়ার পেশাতে ভাটা আসতে শুরু করেছে। নাসিম কুয়ো খোঁড়া বাদে আর সাইকেল চালাতে পারে মাত্র। এই সাইকেল চালানোকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে সাইকিলিস্ট ছবি। বদলে যেতে থাকে পরিবেশ। নাসিম এর আগে তিনদিন একটানা সাইকেল চালিয়েছে, কিন্তু এবার তাকে জুয়াড়িদের দাবি অনুযায়ী সাত দিন চালাতে হবে। আমাদের মত সাধারন মানুষের প্রশ্ন যখন এই আঙ্গিকে পড়ে থাকে, তখন আমারা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ছবিটি দেখতে বসি। ধীরে ধীরে আশির দশকের শেষদিকের আফগান-ইরানের বৃহত্তর রাজনৈতিক-সামাজিক ছবি আমাদের মস্তিস্কে চালান করেন পরিচালক ।


যেখানে ধীরে ধীরে আফগান রিফিউজি বাড়ছে যাদের দেশে খাবার নেই বিদেশে কাজ নেই। এই নাসিম তো তাদের একজন যাকে যেকোনো মূল্যে বাঁচতে হবে। আর একটা শ্রেণির ইরানিয়ান মানুষ যারা তেলের খনির লোভে বালিতে কুয়ো খুড়তে এই নাসিমদের ভাড়া করে। বিস্তর অর্থনৈতিক ফারাক এই দুই শ্রেণির মধ্যে । যারা শখে জুয়া খেলে বাজি ধরে লক্ষ লক্ষ টাকা এই নাসিমরা কতক্ষণ একটানা সাইকেল চালাবে। তারপর, নাসিম কে ঘিরে কার্নিভাল গড়ে ওঠে যেন কোনও জ্যান্ত বন্যপশুর রিং এর খেলা দেখানো হবে এমন ভাবে। শিউরে উঠি যখন গভীর রাতে সারা শহর ঘুমিয়ে পড়ে , জুয়াড়িরা দামি গাড়িতে আরাম করে তখন নাসিম অল্প টাকার জন্য অক্লান্ত সাইকেল চালাতে থাকে। শীত বাড়লে কুঁকড়ে থাকা ছেলেকে যখন গায়ের একমাত্র চাদরটা ছুড়ে দেন তখন দারিদ্রতা পেরিয়ে উঠে আসে বাবা, বা যখন ছেলের আনা ফুল শুঁকে নাসিম হেসে ওঠে তখন কিছুটা সময়ের জন্য মনে হয় এই রিফিউজি নাসিম না হয় ছেলে কে পেয়েছে, বাকি হাজার হাজার নাসিম কি করছে?
সাতদিনের নাসিমের চলার পথ কোনভাবেই সুখের না, কখনো বিরোধী পক্ষের ছড়ানো আলপিন তার সাইকেল অকেজো করে, তো কখনো গুন্ডা সর্দারের ফোনে হুমকি আসে। হঠাৎ বৃষ্টি নামলেও সে থামতে পারে না তাকে চক্রাকারে ঘুরতেই হয় একটানা।
 
 
 
 
 
 
 
 
এই চক্রাকারে ঘোরা শুধু মাত্র সাইকেল চালানো নয়, এটা জীবন বৃত্ত। যেখানে নাসিমদের মত ঘরহীন দেশহীন মানুষদের ঘুরে যেতে হয়। নাসিম কোনও কিছুতেই টলে না , মৃত্যু ভয় তাকে ছোঁয় না, কারণ সে জানে শারীরিক ভাবে সে বেঁচে থাকলেও সমাজের কাছে পরিসংখ্যান গত ভাবে সে মৃত।


তবে ধীরে ধীরে ক্লান্তি নাসিমকে গ্রাস করে। একই সাথে সাত দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় এগিয়ে আসে । বাড়তে থাকে নাসিমের অসুবিধা । সে সাইকেল চালাতে চালাতে দেখে যে কত শত আফগান রিফিউজি কুয়ো খোঁড়ার কাজ পেয়ে চলে যায় । এ অবস্থায় নাসিমকে আক্ষেপ না করতে দেখে আমি বিস্মিত হই। কিন্তু যখন দেখি সেই শ্রমিকরা টাকার জন্য বিদ্রোহ করে তখন বুঝি নাসিম কেন আক্ষেপ করেনি।


নাসিমের নামে রূপ কথা প্রচার হতে থাকে সে নাকি ভারতে হাত দিয়ে ট্রেন থামিয়েছে , যতদিন এগোতে থাকে নাসিমের পক্ষে জুয়ার লগ্নি তত বাড়তে থাকে। তাতে নাসিমের কোনও হেলদোল বাড়ে না। কারন নাসিম জানে তাকে খুব সামান্য টাকা দেওয়া হবে। শেষের দিন এর সিনেম্যাটিক ভাবনা এবং তার প্রকাশ ভঙ্গি যেকোনো মানুষের চোখে জল এনে দেবে । যখন ঘুম আটকাতে নাসিম দুচোখের পাতাতে আলপিন আটকে সাইকেল চালাতে থাকে । তখন ওই আলপিন কি কোনভাবেই যুদ্ধবাজদের দুচোখে ফুটিয়ে দেন না পরিচালক? বা প্রায় অচেতন নাসিমের মুখে যখন তার নিজের ছেলে এক এর পর থাপ্পর মেরে তাকে জাগিয়ে রাখবার চেষ্টা করে তখন কি ওই থাপ্পর গুলো গিয়ে পড়ে না রাষ্ট্রনায়ক দের মুখে , যারা সীমানা নির্ধারণ বা শান্তির খোঁজে যুদ্ধ করে। হ্যাঁ পিন ফোটে দু চোখের রেটিনা জখম হয় , থাপ্পর সজরে পড়ে শক্তিশালী মানুষদের মুখে। আর পড়ে বলেই আজ ২৫ বছর পর বাংলার গ্রামে বসা একটা ঋত্বিক ঘটক পাগল ছেলে ইন্টারনেটে তন্ন তন্ন করে খুজে এই ছবির প্রেক্ষিত খুজে না পেয়ে পাগলের মত লিখতে শুরু করে। রিফিউজি যন্ত্রণা নিয়ে ছবির কেন কোনও সৎ ব্যাখ্যা থাকেনা? কেন? কেন আপসহীন মানুষ গুলকে নিয়ে আপোষ করে পরের দিকে কিছু ভেকধারি?


নাসিম তো আপোষ করে না জেতার আনন্দে মাতে না , তার চারিদিকে অজস্র টিভি ক্যামেরা দেখে সে উচ্ছাস প্রকাশ করে না। নাসিমের সাতদিন পূর্ণ হয়ে যায় নাসিম তাও থামেনা । আসলে সে থেমে করবে টা কি? তাকে রিফিউজি জীবনের বৃত্ত আষ্টেপৃষ্টে বেধে ফেলেছে। সে জানে এই ঘূর্ণি থেকে বেরলে অন্য কোনো ঘূর্ণি তার জন্য অপেক্ষা করছে। পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় এক মিলিয়ন আফগান রিফিউজি আছেন ইরানে। আর অবাক হয় না কুর্নিশ জানাই পরিচালক বাফকে। কুর্নিশ করি গার্ডেনার ছবির জন্য। কুর্নিশ করি আমাকে সাহস দেওয়ার জন্য।



ছবিঃদ্য সাইকেলিস্ট

পরিচালকঃ মহাসিন মাখমাল বাফ।


মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

মধ্যরাতের শিশুদের ম্যাজিকের মোহভঙ্গ



সেলিব্রিটিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য যদি বলা হয় তাহলে প্রথমেই আসে যে তারা সবসময় বিতর্কে থাকতে পছন্দ করে। বিতর্কই তাদের লাইমলাইটে তলায় এনে দার করায়। কিন্তু যে বিতর্কের আগুন বহুদিন ধরে চলছে, যে বিতর্ক সরকার পাল্টালেও বদলাও না। সেকি শুধুই কিছু উগ্র মৌলবাদীদের ঔদ্ধত্য ফলানোর জন্য না এর পিছনেও গভীর রাজনৈতিক চাল আছে। সেসব অতীব চালাক ব্যক্তির পক্ষ্যেও সহজে বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের মত মুর্খের পক্ষে তো নইই। কেননা আমরা তো গণতন্ত্র বুঝতে শুধুমাত্র ভোটদান পর্বকেই বুঝি। থাক সেসব জটিল আলোচনায় গিয়ে লাভ নেই। মুল আলোচনায় ফিরে আসাই ভাল। কিন্তু এসব ভাবার একমাত্র কারন হল বঞ্চনা। কেন আমরা সাধারন মানুষ বারবার কিছু নিষ্ঠুর অসামাজিক দায়বদ্ধহীন মানুষের জন্য বঞ্চনার স্বীকার হব। কেন ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিদেশী লেখিকাকে রাজ্যহীন করা হবে, কেন একজন সাধারন মানুষ সেই দিনে আর্মিদের অজস্র প্রশ্নের উত্তর দেবে, কেন সর্বদা একটা ভয় নিয়ে সেদিন কোথাও যেতে হবে, শুধুমাত্র সে প্রতিষ্ঠান বিরোধী লিখেছে বলে? এ প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না কারন সেই ট্র্যাডিশন আজও ক্রমবর্তমান। শুধু একরাশ কালো অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে নেয়। ইচ্ছে গুলোকে নেতিয়ে দেয়, স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিনত করে।
অনেক আগেই শুনেছিলাম যে এবারের বইমেলায় সাহিত্য আলোচনা সভার মূল বিষয় “ছবি”। সিনেমার ছাত্র হিসাবে তাই খানিক আগ্রহই বেড়ে গিয়েছিল। আরও বাড়ল যখন সলমন রুশদি তার উপন্যাসের চলচ্চিত্রকরন নিয়ে আলোচনা করতে আসবেন পরিচালক দীপা মেহেতাকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু হল না। রাজ্যে তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হল না। সরকারি ভোট ব্যাঙ্ক বহাল তবিয়তেই রইল। শুধু আলোচনা সভাটাই ভেস্তে গেল। তাই খানিক বিমর্ষ হয়েই চলে গেলাম “ মিডনাইটস চিলড্রেন” দেখতে। পকেটে টাকার অভাব এ যাত্রায় খানিক বাচল খয়েরি মানিব্যাগের সৌজন্যে।
গোটা ছয় মানুষ সারা সিনেমাহল জুড়ে। আমরাই মনে হয় একমাত্র যারা সিনেমাটাই সত্যি দেখতে এসেছি। পপকর্ন খেতে বা গলা জড়িয়ে বান্ধবীর সাথে গল্প করতে নয়। উপন্যাস পড়ার সৌভাগ্য হয় নি। এমনিতেই ভীতু তার ওপর আবার ৬০০ পাতার গভীর একটা ইংরাজি উপন্যাস। সে যাই হোক ৬০০ পাতা না হয় না পড়লাম কিন্তু ১৩০ পাতার চিত্রনাট্যের চিত্ররূপ দেখলাম। যেহেতু প্রেক্ষাপট স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ভারতীয় সমাজ। তাই সহজ ভাবেই বলা যেতে পারে যে ছবির দৃশ্য গ্রহণ পুরোটাই ভারতে গৃহীত হবে। কিন্তু মৌলবাদী চিন্তাবিদদের আক্রমণের প্রভাবে ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের অমসৃণ আচরনের ফলে ছবির অধিকাংশ দৃশ্য গৃহীত হয়েছে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে, উইন্ডস অফ চেঞ্জ ছদ্মনাম দিয়ে। তাও ছবির দৃশ্য গ্রহণ বন্ধ ছিল যখন ইরান শ্রীলঙ্কার সরকারের কাছে ছবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। পরে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট এর হস্তক্ষেপে ছবির দৃশ্য গ্রহণ আবার পুনরায় শুরু হয়।
সলমন রুশদি এখানে ছবির বিবরক। তার গলায় তার ভাষায় তার শব্দে আমরা গল্প শুনি। ছবির চিত্রনাট্য ও তার লেখা। এখানেই আসল মুশকিলটা হয়ে গেছে। রুশদি নিজে তার ৬০০ পাতার উপন্যাসকে ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটের পর্দায় চিত্রায়িত করার সময় তিনি ছবির কোন ঘটনাকে প্রাধান্য দেবেন আর কোন ঘটনাকে সুক্ষ ভাবে এরিয়ে যাবেন তিনি বুঝতে পারেন নি। লেখক-চিত্রনাট্যকেরের মধ্যে এটাই সমস্যা যে তিনি একবারও তার গল্প থেকে বেরোতে পারেন না। চিত্রনাট্যও তাই এক্ষেত্রে গাল্পিক হয়ে গেছে। সাহিত্যাকারে গল্প আমরা পর্দায় দেখি। সিনেমার ভাষা আর সাহিত্যের ভাষা কে এক্ষেত্রে আলাদা করা যায় না। তাই প্রায় ৪৫ মিনিট লাগে পরিচালকের ছবির সব চরিত্রকে স্বকীয় ভাবে স্থাপন করতে।
ছবির একটা বড় অলঙ্কার হল সময়। ১৯১৭ থেকে ১৯৭৭ সাল অবধি সময়কে এখানে ধরা হয়েছে। এই সময়ের ব্যাবধানে যা যা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে সবই ছবির এক একটা অঙ্ক। স্বাধীনতা, পাকিস্থানের গৃহযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, এমারজেন্সি ইত্যাদি সব। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলি আমার মনকে ছুঁয়ে যায় নি। আমি স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে জাতীয় সঙ্গীতের সময় উঠে দাড়িয়ে বীরত্বে বুক ফুলিয়ে উঠিনা। জয় বাংলা স্লোগান আমায় উজ্জিবিত করে না। করবেও না। কারন ছবির যে অংশে এসে মুক্তিযুদ্ধ আসে বা এমারজেন্সি সেই সময়টার পর্দার উপরিস্থ দৃশ্য বড় প্রাণহীন। মৃত ব্যক্তির দেহ সবুজ বাংলার মাঠে শুইয়ে দিলেই আর মুজিবর রহমানের ছবি দিলেই কি প্রাণহীন ওই দেহ গুলির ওপর ভার্চুয়াল প্রাণের সঞ্চার হয়। যেমন ছবির চরিত্র গুলোর মধ্যেও প্রাণের বড় সমস্যা। কে প্রাধান্য পাবে আর কে না সেটা বোধহয় পরিচালক গুলিয়ে ফেলেছেন। তাই মূল প্রটাগোনিস্ট নিজের মুখেই কখনও বলে ওঠে তার ঠাকুরদা ঠাকুরমার প্রেম কাহিনী। যে গুলো নিছক অবাঞ্ছনীয়। কোন প্রয়োজন ছিল না ছবির সাথে তাল মিলিয়ে এই অংশকে পর্দাস্থিত করার। বরং যেটা বেশি প্রয়োজন ছিল সেটা হল ছবির প্রাণ ভোমরা যেখানে লুকিয়ে আছে সেই ম্যাজিক রিয়ালিজম এর অংশকে।
সেলিম ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭এ রাত ১২ টা বেজে জন্ম নেয়। বড় হওয়ার সাথে সে নতুন এক দিকের কথা জানতে পারে। নাকের সর্দি যখন টানে তখনই তার সামনে সেই সব চরিত্ররা এসে হাজির হয় যারাও সেই মধ্যরাতে জন্ম নিয়েছিল। তারা আলোচনায় বসে, কনফারেন্স করে, নতুন ভাবে সমাজকে সাজানোর স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পরক্ষনেই সেই স্বপ্ন হারিয়ে যায় আর ছবি তত গতিহীন হয়ে যখন এই ম্যাজিক চরিত্রগুলি বাস্তবে ফিরে আসে, আবার আবরা-কা-ডাবরা বলে জ্যান্ত মানুষকে ভ্যানিস করে সীমান্তের বেড়াজাল টপকায়। যেখানে স্থান পায় ব্ল্যাক ম্যাজিক, পরকীয়া প্রেম আর তদুপরি সমসাময়িক রাজনীতি। যে রাজনীতির স্বীকার এই মধ্যরাতের শিশুরাও, সুস্থ সময় ফিরিয়ে আনার তাগিদে তাদেরও  জেলবন্দী করা হয়। কিন্তু যার আদেশে যে করে সেও তো ওই মধ্যরাতেই জন্ম নিয়েছিল, তাহলে সে পার পেয়ে যায় কি করে? যে বন্দীকরন আসলে সাম্প্রদায়িক পরস্থিতিকে কটাক্ষ করার জন্য লেখা হয়েছিল সেই বন্দীকরন ছবির এই পর্যায়ে এসে খাপ খায় না। মেনে নেওয়া যায় না ম্যাজিক এর গল্প বাস্তবে ফিরে এসে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়।
ম্যাজিক রিয়ালিজম, আসলে ম্যাজিকের আঙ্গিকে বাস্তব পরিস্থিতিকে কটাক্ষ করা। যেমন ফারনান্দো সোলানাস তার জার্নি ছবিতে তুলে ধরেছেন। কমিক বইয়ের চরিত্ররা বাস্তবে এসেও তাদের কমিক আঙ্গিকটা ঠিক ধরে রেখেছিলেন। বাস্তবে এসেও তারা ম্যাজিকের চরিত্রর মতনই ছিল। আলাদা ভাবে বাস্তবে মিশে যাই নি। বরঞ্চ সুকৌশলে তারা বাস্তব পরিস্থিতিকে কটাক্ষ করেছেন। এখানে পার্বতী বা অন্য কেউ কোন ভাবেই পারে নি। তারা বাস্তবেও বড়ই অমসৃণ হয়ে আছে। সেলিমের জার্নি আর সোলানাসের জার্নি তাই বিষয়গত ভাবে ম্যাজিক রিয়ালিজমের ওপর ভিত্তি করে চললেও কখনই সমান্তরাল ভাবে এগোতে পারে নি একে ওপরের সাথে। ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।
চরিত্রদের মধ্যের দ্বন্দ্ব, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ এসবও ছবিতে থাকে না। আসলে দুর্বল চিত্রনাট্যে চরিত্ররা প্রাণ পায় না। সঙ্গীত দিয়েও তাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা যায় না। ছবির সঙ্গীতও বড়ই দুর্বল তাই। দৃশ্যকে দর্শকের মনে গেঁথে নেওয়ার ক্ষেত্রে সঙ্গীত কোন ভাবেই সাহায্য করতে পারে না।
পরিশেষে বলতেই হয় যে এক ঝাক অভিনেতা অভিনেত্রীদের দুরন্ত অভিনয়, পরিচালকের সহজাত বুদ্ধিমত্তা সত্ত্বেও “মিডনাইটস চিলড্রেন” মধ্যরাত্রির গগনে ধ্রুবতারা হয়ে দিক দেখাতে অক্ষম। যে ম্যাজিক উপন্যাসে স্থান পেয়ে ৩৩ বছর আগে রুশদিকে বুকার পুরস্কার এনে দিয়েছিল সেই ম্যাজিক দীপা মেহেতার হাত দিয়ে আজকের বাস্তবে এসে ম্যাজিকের রূপ নেয় না। বড়ই সোজা সাপটা ভাবে একটা বড় সময়কে পর্দায় ধরা ছাড়া আর কিছুই করতে সক্ষম হয় না।

ছবিঃ  মিডনাইটস চিলড্রেন।
পরিচালকঃ  দীপা মেহেতা।
প্রযোজনায়ঃ  ডেভিড হ্যাম্লিন্টন, ডগ ম্যাঙ্কফ, স্টিভেন সিলভার, নেইল টাবাজনিক প্রমুখ।
অভিনয়ঃ  সত্য ভব, শ্রেয়া সরেন, সিদ্ধার্থ, সাবানা আজমি, রজত কাপুর, অনুপম খের, রাহুল বোস, সাহানা গোস্বামী, দর্সিল সাফারি প্রমুখ।


শনিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৩




প্রথম বার কোনও শিশু শ্রমিক তৃতীয় লাইন থেকে গেয়ে ওঠে

 “ সারে জাহাসে আচ্ছা”




                  ফেলে দেওয়া, ভাঙাচোরার ডাস্টবিনের জিনিষ বাছাই করা ছেলে , কাকুর কাছে থাকে নাম ‘গাট্টু’ । জানতে পারি সে অনাথ , বাবা মা নেই ঘিনেঘিনে নোংরা গলিতে তার বসবাস কাকার সাথে। আর কাকা বাদে আর একটি প্রাণী তার কাছের “ টাইগার” , গাট্টুর প্রিয় ভেড়া। যার দিন শুরু হয় গাড়ির একটা ভাঙাচোরা সীট থেকে ,সে বিছানা হিসাবে ব্যবহার করে, কাকুকে খাবার তৈরি করে সে কাবারি/দি বাছাই এর কাজে লেগে পড়ে। কিন্তু আকাশে ঘুড়ি দেখলেই তার মন উত্তাল হয়। আর কাজের ঠিক থাকে না সে বেরিয়ে পড়ে। সে অন্যদের সাথে খুব একটা মেসে না। ঘুড়ি ধরার থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর দিকে তার ঝোঁক অনেক বেশী। সে সরাসরি লড়াইতে আসতে চায় আকাশের উচুতে ওরা ঘুড়ি গুলির সাথে। এখানেই আমরা পরিচিত হয় “ কালী” নামের এক শক্তিশালী ঘুড়ির সাথে। পরিচালক প্রথম পাঁচ মিনিটেই হানা দেন আমাদের সব থেকে প্রিয় শৈশবে। আমরা একাত্ম হয়ে পড়ি ছবির সাথে।



গাট্টু ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে , টাকা চুরি করে । নীল আকাশ তার কাছে নেশার মত। বার বার সে ঐ “কালী” ঘুড়ির সাথে অসম লড়াই তে হেরে যেতে থাকে । আর প্রতিবার তার চোয়াল সক্ত হয় জেদ বেড়ে যায় নতুন প্রস্তুতি নিয়ে আবার ঘুড়ি যুদ্ধে আসতে চায়। এই পর্বে আমাদের ভাষাতে গাট্টুর “ স্ট্রিট স্মার্টনেস” ফুটে ওঠে দারুন ভাবে । সে পাড়ার দোকানদার এর মেয়েকে ডিভিডি এনে দেওয়া হোক বা পাড়ার দর্জিরকে পোটিয়ে ছাদ পাওয়া হোক। এসবের মাঝেও কোথাও একটা নিজস্ব স্নেহ বোধ কাজ করে যে কারনে সে তার পোষা ভেড়া যাকে টাইগার নামে ডাকে তাকে নিয়মিত দুধ খাওয়াতে ভোলে না। আমরা ধীরে ধীরে গাট্টুর সাথে এক হয়ে যেতে থাকি যে কারনে টাকা চুরি করার মত কাজেও হাত তালি দিয়ে ফেলি। আমাদের মননও গাট্টুর ওড়ানো ঘুড়ির সাথে উড়তে থাকে আকাশে। ফলে দু একটা দৃশ্যে অতিপাকামিকে আশকারা দিয়ে ফেলি। কিন্তু পর্বের চেষ্টাও ব্যার্থ হয়।



পরিচালক রাজন খোসা এখানেই আসল কাজটা করেন নিছক একটা ঘুড়ি কেন্দ্রিক গল্পকে অন্য উচ্চতাতে নিয়ে ফেলেন । বিসন্ন গাট্টু জানতে পারে তার এলাকার স্কুলের ছাদ সব থেকে উচু যদি শেখান থেকে ঘুড়ি ওড়ানো সম্ভব হয় তবে “কালি”কে কাটা সম্ভব। কোনোদিন স্কুলে না পড়া গাট্টু এক অদ্ভুত চতুরতাতে ভর করে ভর্তি না হয়ে স্কুলে ঢুকে পড়ে। সে নতুন জগতের খোজ পায়। প্রথম বার কোনও শিশু শ্রমিক তৃতীয় লাইন থেকে গেয়ে ওঠে “ সারে জাহাসে আচ্ছা”। সে প্রথমবার জানতে পারে জন্মদিন নামে একটা ব্যাপার আছে। ঘরে ফিরে কাকাকে প্রশ্ন করে “ কাকা আমার জন্মদিন কবে?” কাকা উত্তর দিতে পারেন না । শুধু বলেন তোকে তোর বাবার থেকে কিনেছিলাম। এখন ঘুমিয়ে পর আর এসব পাগলামি ছেড়ে মন দিয়ে কাজ সেখ । সিনেমা হল নিঃশব্দ হয়ে যায় হটাৎ। একজন গাট্টু নয় , লক্ষ গাট্টুর কথা এভাবে প্রকাশ হয়।



ছবিটি মহান বানী দানের ছবি হয়ে ওঠার তৃতীয় এবং সবথেকে জোরালো সম্ভবনা কে বাদ দিয়ে এখান থেকে পরিচালক আবার ঘুড়ির গল্পে ফেরত আসেন । আমি আপ্লুত হয়ে পাসে বসা ফিল্ম স্টাডিস পড়া আদিত্যর দিকে চোখ ইশারা করে জানিয়ে দি । এই পরিচালক আমার প্রিয়তম পরিচালক দের তালিকাতে ঢুকে পরলেন। গাট্টু বুঝতে পারে ক্লাস করতে হলে বই নামক বস্তুর প্রয়োজন হয়, সে সেটাও চুরি করে অন্যের ব্যাগ থেকে এবং ধরাও পড়ে সহপাঠীদের হাতে । শেখান থেকে আবার অন্যভাবে বন্ধুত্বের শুরু হয় এ বারের মত গাট্টু সাস্তির হাত থেকে বেচে যায়। যারা সালাম ডগ মিলিয়নিয়ার “ স্টোরি টেলিং” পছন্দ করেছিলেন তাদের কিন্তু এছবিও ভালো লাগবে। গাট্টু শেষ পর্যন্ত স্কুলের ছাদে যেতে সফল হয় এবং একই সাথে কাকার কাছে ধরা পড়ে যায় যে সে দীর্ঘদিন কাজ না করে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। প্রবল বকুনি জোটে। হায়-রে সর্ব শিক্ষা , হায়-রে শিক্ষার অধিকার।



গাট্টুর জীবন কঠিন হয়ে ওঠে একদিকে নিজের ঘুড়ি ওড়ানোর যুদ্ধ, একদিকে কাকার বকুনি, একদিকে বন্ধুত্ব একদিকে ভালো লেগে যাওয়া স্কুল একসাথে ঘুড়ির প্যাঁচে আটকে ফেলে ছোট্টো ছেলেটাকে। যেমন আমরা আটকে পড়ি প্রতিমুহূর্তে জীবনের “কালি”র সুতোর প্যাঁচে।   গাট্টু কি পারল সফল হতে? এটুকু যারা দেখেননি তাদের জন্য তোলা থাক। তোলা থাক রাজন খোসার মুন্সিয়ানা। 



বরং কথা বলা যেতে পারে ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্যের গ্রাফিক্স নিয়ে। কথা হোক একটা ছোট্ট গল্পের মধ্যেকার এই “সময়” এর “ডকুমেন্টেশন” নিয়ে। কথা হোক শিশু শিল্পী মহম্মদ সামাদ(গাট্টু) এর পুরো ছবি জুড়ে পা টেনে টেনে হাটার অভিনয় নিয়ে। নরেশ কুমার হিসাবে গাট্টুর কাকাকে নিয়ে। তবুও এছবির অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়ে আমার কাছে কোনও খবর নেই।



তবে অন্য এক “দেখা” দেখলাম আমি, তা কিছুটা এরকম

     ২০ এপ্রিল ২০১২, শুক্রবার , খুব কম প্রচার করেই রিলিজ হয়েছিলো গাট্টু একটু ব্যাস্ততা ছিল তাই ভেবেছিলাম ৩/৪ দিন পরে দেখব ছবিটা। কিন্তু আমার সময়ে যখন আমি পৌছলাম দেখলাম শো টাইম পরিবর্তন হতে হতে দিন পিছু মাত্র একটা শো হচ্ছে। চিলড্রেন ফিল্ম তো নাকি মার্কেট নেই।




     ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, শুক্রবার , নন্দন চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্ট সেই সন্ধ্যা ৬ টায় শো কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটে থেকেই ভীষণ লম্বা লাইন পড়েছে। সবাই গাট্টু দেখতে এসেছেন। কতশত আলোচনা উঠে এলো শেখান থেকে কেউ বলছেন বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানীর ছোটবেলার গল্প তো কেউ বলছেন কোনও এক মুম্বাই খ্যাত ডাক্তার এর ছোটো বেলার গল্প। তখনও ঊশষী আসেনি ফলে আমি আর আদিত্য এসব উদ্ভট গল্প শুনছিলাম । সবটাই বাচ্চাদের মা- বাবা দের তৈরি আসলে বুঝলাম এটা সেই সংক্রামক মানসিকতা যারা তাদের বাচাকে একদিন সময় করে একাডেমিক এর বাইরে নিয়ে সেদিন এর গাট্টু দেখাতে নিয়ে যান নি। সেটা হলে নিছক ঘুড়ি ওড়ানো একজন শিশু শ্রমিক এর কথা গল্পে কিছুতেই ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার এর কথা আসতো না।  মনটা খুব আবেগপ্রবন হয়ে ওঠে পকেট থেকে সেল ফোন বের করে গাট্টুর পরিচালক রাজন খোসা কে মেসেজ করি এই ভিড় এর কথা জানিয়ে। এতো মানুষ একসাথে কোলকাতাতে ওনার ছবি দেখতে ভিড় করেছে জেনে উনি খুশি হয়ে শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়ে মেসেজ করেন। রাতে কথা হবে এই মর্মে।



প্রযোজক- চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া
পরিচালক – রাজন খোশা
চিত্রগ্রহণ- সত্য রাই নাগপাল
অভিনয়- মহম্মদ সামাদ , নরেশকুমার







সোমবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৩


দাবাং-২



হেয়ার স্কুল এর সামনের ফুট পথে যে ঘুঘনি পাওয়া আমরা নাক মুছতে মুছতে জিভে শব্দ করে খাই বা বিবেকানন্দ পার্কের ফুচকাতে কোনও বিশেষ খাদ্যগুণ আছে এমনটা কিন্তু আমার জানা নেই। তবুও শুধু স্বাদ এর আকর্ষণে পেট খারাপের ঝুকি নিয়েও বিকেল হলেই মন ছুটে যাই সেদিকে। স্বাদ এর কথা যখন এলো তখন বলি এবছরের বাণিজ্যিক হিন্দি ছবির সেরা রাধুনি সলমান খান এর সেরা ডিশ কিন্তু “ দাবাং-২” । স্বাদে , গন্ধে, রূপে এক দারুন সংমিশ্রণ অকারনে সিনেমাটিক ভিউ খুজতে গিয়ে ফিল্ম স্টাডিজ এর ছাত্রদের মত খুত না ধরেলে কিন্তু এক উপভোগ্য ছবি। খুব সাধারন একটা  গল্প কিভাবে মশলা দিয়ে সুস্বাদু করতে হয় তার নিদর্শন।


চুলবুল পাণ্ডে এখন বদলি হয়ে কানপুর এসেছেন, পরিবার নিয়ে , মানে বাবা, ভাই, স্ত্রী সবাই কে নিয়ে। এখানেই তিনি ঠিক করে দেন দাবাং যদি ঘর ভাঙার কথা হয়, তবে দাবাং-২ সবাইকে নিয়ে ঘর বাধার গল্প। বাবা প্রজাপতি বা ভাই মাখন বা স্ত্রী সকলের মধ্যে সেই একসাথে থাকার সুখি ছবি স্পষ্ট। ফলে আগের ছবির বাবা ছেলে বা ভাই-ভাই লড়াই এখানে নেই, তাহলে দাবাং-২ মারামারি নেই? আল্ বাত আছে এখানে ছেদি শিং নেই তাতে কি হয়েছে বাচ্চা ভাইয়া তো আছেন তবে তার সাথে পুলিশ চুলবুলের লড়াই কিন্তু সারা ছবি জুড়ে নয়। কানপুরে বরং তিনি অনেক ছোটো ছোটো দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করেন তা মেয়ের বিয়েতে বাধা দেওয়া গুন্ডা কে মেরে হোক বা বয়স্ক মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করা পুলিশ কনেস্টেবল কে “ বাবার সাথে এই ভাবে কথা বল নাকি?” এই ভাবে ধমকে হোক। ফলে সারা ছবি জুড়ে এক বন্ধুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা দেওয়া পুলিশ কে দেখি। দাবাং এর তুলনাতে মারামারি অনেক কম করেছেন ঠিক কিন্তু যে টুকু করেছেন তা কিন্তু টেকনিক্যালি ভয়ানক শক্তিশালী যেমন এক ঘুষিতে গুণ্ডাদের ক্যামম্বিস বলের মত বাউন্স করিয়ে দিতে পারেন বা এক লাথিতে রোলারের মত গড়িয়ে দিতে পারেন ।




এই চুলবুল ঘরে ফিরলে অন্যরকম স্ত্রীর সাথে খুনসুটি করেন , যা দেখে বিবাহিতা নারীদের ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া স্বামীদের ওপর যথেষ্ট রাগ হতেই পারে। আবার বাবার সাথে ছাদে পাশাপাশি শুয়ে ফেলে আসা অতীতের গল্প শোনার জন্য বায়না করতে পারেন। মৃত মা এর ছবির সামনে দাড়িয়ে ছবির সাথে কথা বলতে পারেন। আবার ভাই মাখন এর অল্পবুদ্ধি নিয়ে মজা করতে পারেন। কিন্তু  জামা খোলা সলমান এতো সংসারি হয়ে গেলে “ঝান্ডুবাম খ্যাত” মুন্নিদের কি হবে ? অবশ্যই কিছু হবে আর হবে বলেই তিনি করিনার সরু কোমর এর জাদু দিয়ে “ফেভিকল” আটকেছেন, আমাদের জন্য নিজে আইটেম নেচেছেন। গরম মালাইকা কে পর্দাতে এনেছেন দারুন ভাবে।


ছবির সেরা অংশ সন্তানসম্ভবা স্ত্রী কে নিয়ে আর বড় পরিবার গড়ার প্রস্তুতি চলাকালীন বাচ্চা ভাইয়ার অত্যাচারে  সন্তান- ভ্রুন নষ্ট হয়ে গেলে প্রতিশোধকামী স্বামী হিসাবে পুলিশ চুলবুল এবং সন্তান হারার যন্ত্রণা ক্লিষ্ট নারী হিসাবে তার স্ত্রীর বাকরুদ্ধ মুহূর্তে প্রতিশোধ এর প্রতিজ্ঞার জন্ম দেওয়া দৃশ্য, ছবির ক্লাইমাক্স এর জন্ম দেয়। এরপর আমরা বহু প্রতীক্ষিত নায়ক কে দেখি।


কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে কেন সারা ছবি জুড়ে এতো মুখমুখি লড়ায় এর সম্ভবনা থাকা সত্তেও , বাচ্চা ভাইয়া আর চুলবুল কে মাত্র একবার সামনাসামনি লড়তে দেখি ছবির শেষে আসলে। এখানে আমার ব্যাক্তিগত একটা মনে হওয়া আছে বাচ্চা ভাইয়ার চরিত্রে অভিনয় করা প্রকাশ রাজ এর আগের হিট ছবি “সিঙ্ঘম” এর সাথে এই ছবির চরিত্রটা এক হয়ে যাক এটা বোধ হয় চান নি পরিচালক বা সলমান নিজে।


ফলে এক নতুন সম্ভবনা তৈরি হয় ছবির শেষে গিয়ে , যেখান থেকে খুব সম্ভবত দাবাং-৩ হবে। কি সেই সম্ভবনা তা বললে তো সব বলা হয়ে গেল বরং নিজে এই ছবি দেখুন বুঝতে পারবেন নিজেই।


দাবাং এর পরিচালক ছিলেন অনুভব কাশ্যপ এখানে তিনি অনুপস্থিত তার জায়গা সামলেছেন আরবাজখান। ফলে কিছু ফাঁকফোকর থাকা টা স্বাভাবিক এবং ছিলও কিন্তু ব্র্যান্ড চুলবুল তার নিজের সাত রঙের ঝলকানিতে তা ঢাকার চেষ্টা করেছেন খুব করে। সে মারামারির দৃশ্যে ক্রেন এর ওপরের ক্যামেরাকে হাতের ইসারাতে নিচে ডেকে হোক বা উত্তরপ্রদেশ , বিহারের এর দর্শক দের কথা মাথায় রেখে একাধিক আইটেম নম্বর রেখে হোক, বা মাহিগিল এর মত সুন্দরী কে খুব ছোট্ট অংশে পর্দাতে এনে হোক বা সাজিদ- ওয়াজিদ এর মিউজিক দিয়ে হোক , বা প্রকাশ রাজ এর হাড়হিম করা চাহনি দিয়ে হোক। আসল কথা সলমান হলেন সেই পাক্কা রাধুনি যিনি সুস্বাদু বিরিয়ানি রান্না করতে এবং খুব তাড়াতাড়ি বেচতে পারেন। যে কারনে প্রথম চারদিনে ছবির বিক্রি ১০০ কোটি পেরিয়ে যেতে পারে নিশ্চিন্তে।  তবে ফিল্মবোদ্ধা দের আশঙ্কা “ যে পরিমান অ্যাকসান–কমেডি গোছের ছবি হচ্ছে তাতে দর্শক খুব তাড়াতাড়ি স্বাদ বদল করার জন্য অন্য কিছু খুজে নেবে না তো?”  ফ্রেম চলতে থাক বক্স অফিস এর উত্তর নিশ্চয় দেবে।




অভিনয় : সলমন খান, সোনাক্ষি সিংহ, প্রকাশ রাজ,
করিনা কপূর, বিনোদ খন্না, আরবাজ খান, মাহি গিল প্রমুখ পরিচালনা : আরবাজ খান
প্রযোজনা : আরবাজ খান ও মালাইকা অরোরা খান

সঙ্গীত : সাজিদ-ওয়াজিদ
সিনেম্যাটোগ্রাফি : অসীম মিশ্র

বুধবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৩


ফের চলে যাবে করে একলা আমাকে



অগুনতি তারে আটকে ছিলাম , বাইরে পারদ খুব দ্রুত নিচে নামছিলও ,এর মধ্যে আমার ছ’বছরের পুরনো সেল ফোনে একটা এসএমএস এলো“আজ বিকাল তিনটেয় ময়দান , রোদে পিঠ দিয়ে বসবো । আজও যদি দাড় করিয়ে রেখেছিস খুব মার খাবি কিন্তু । প্লিজ ভুলে যাস না যেন আমি আজ কিন্তু রিহার্সাল যাব না' তোর জন্য” আমি তাড়াতাড়ি ছুটি চেয়ে পাড়ি দি ময়দান। দেরি হলে যে আবার আয়ত চোখের শাসন জুটবে খুব করে।  আসলে এ সম্পর্কের যে নাম দেওয়া যায় না বন্ধুত্বের থেকে বেশী আবার প্রেমের থেকে কম।


ফিরতি পথে ভাবছিলাম এমন সম্পর্ক এ শহরের পাজরে প্রতিদিন নতুন রঙ নিয়ে আসে বলেই আজও অসময়ে বৃষ্টি হয়। ভাবছিলাম এমন বিষয় নিয়ে কেন ছবি হয় না। কান , বার্লিন , টরেন্টো তে যারা বাংলা ছবি পাঠান তারা এমন “বোকা–নন ইন্তেলেকচুয়াল” বিষয় নিয়ে ভাবেনা না । আর যারা ওখানকার জন্য ছবি বানান না তাদের ছবি তো আবার টার্গেট অডিয়েন্স এর জন্য হিরো কে প্রচণ্ড মারপিট করতে হবে , ভীষণ নাচতে হবে সে এক ভীষণ জটিল ঘটনা বটে।




এসব ভাবতে ভাবতে আজ দেখে ফেললাম “বোঝে না সে বোঝে না” । এবং দেখলাম অসাধারন এক গল্প বলেছেন রাজ চক্রবর্তী। সম্ভবত তার এখন পর্যন্ত সেরা ছবি । যার প্রতিটা কোনায় কোনায় উকি মারে বাংলা , উকি মারে আপনার প্রথম যৌবন এর অনুভুতি । একটা অ্যাক্সিডেন্ট , অনেক নাম না জানা সম্পর্ক আর ঘরে ফেরার টান দিয়ে বোনা এছবি।  নুর মুর্শিদাবাদ এর ছেলে প্রেমে পড়ে ছটফটে মেয়ে রিয়ার । নুর নিরীহ সুবোধ বালক যে লেদ কারখানাতে কাজ করে আর রিয়া খুব ছটফটে স্মার্ট নার্স । সারা ছবি জুড়ে অদ্ভুত তাদের বিচরন । নুর এর ওপর রিয়া এক এর পর এক প্রেম এর অত্যাচার করতে থাকে বাদ যায় না কিছুই , সে রিয়ার পুলিস অফিসার বাবা হোক বা ছ’বছরের অপছন্দের ছেলেকে দিয়ে মার খাওয়ানো । এখানেই পরিচালক আসল খেলা টা খেলেন নুর এক রক্ত মাংসের মাসে ছ’হাজার টাকা উপার্জন করা লোক সে কিছুতেই সুপার হিরো হয়ে ওঠে না । সে মারামারি করতে পারে না , মদ খেতে পারে না, বান্ধবী কে জড়িয়ে ধরতে পারে না , এমন কি ঠিক ভাবে প্রপোজ ও করতে পারে না তবু সে একটা জিনিষ পারে “ ভালোবাসতে”। আপনার আমার মত মানুষ যে শুধু ভালবেসে যেতে পারে নাই বা থাকল সেখানে শহুরে চালাকি । মালদা পর্বের এই অংশে রাজ যে মালদা কে তার চোখে ধরেছেন টা কিন্তু বাংলা ছবি থেকে বহু বছর আগে হারিয়ে গেছে । অসামান্য সেই পুরনো ইটের শহর এখানে খুব জীবন্ত , কাশ ফুল , আর ধান খেত আর জল ভর্তি ঝিল।
   

বাস দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হওয়া ছবি আসলে আমাদের প্রেমের সফর করাতে থাকে ছবি জুড়ে যেখানে আমরা পরিচিত হই বালুরঘাটের এক মেয়ের সাথে যে প্রথম বার কলকাতায় এসে পথ চিনতে সাহায্য নেয় কোলকাতার এক ছেলের থেকে সে পথ চলা একেবারে কোলকাতার যেখানে জীবন্ত ধর্মতলা থেকে সেক্টর ফাইভ সব খুব প্রতিদিনের মত করেয় ধরা দেয়।  আমরা চিনতে পারি ছবির শেষে গিয়ে মেয়েটি জয়ী আর ছেলেটি অভীক। যে পথ হারানোতে তাদের প্রথম পরিচয় সে পথ তাদের আবার মিলিয়ে দিল এক মৃত্যু আবর্তে। প্রত্যেক চরিত্র আমাদের ভাষা তে কথা বলে বলেই জয়ী বলে উঠতে পারে “গালে কাটা দাগওয়ালা ছেলেটি কোলকাতার হলেও ভালো ছেলে , প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না এখন তো বেশ ভরসা হচ্ছে , কখনো বালুরঘাট এলে আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু” বা রিয়া বলতেই পারে “ তুমি তো আমার চেনা কেউ না তাই রক্ত পরীক্ষা করে দেখে নিলাম তোমার এইডস আছে কিনা”


ছবির শেষ টা বলা উচিত হবে না তবে “বোঝে না সে বোঝে না” গানটি যদি ছবির অনুভূতির প্রমান হয় তবে “ না রে না” কিন্তু পরিচালক এর ম্যাজিক, ক্রমশ সংক্রমিত হচ্ছে এই পিকনিক মরসুমে। আর যান্ত্রিক সুবিধা যে শুধু মাত্র হিরোগিরীতে ব্যবহার এর ভুল ধারনা ভেঙে দিলেন পরিচালক বাস এক্সিডেন্ট এর দৃশ্যে। শেষ তিন বছরে এতো শক্তিশালী এক্সিডেন্ট এর চিত্রগ্রহন বাংলা ছবিতে হয়নি। পুরো ছবি দিনের আলতে সুট হয়েছে তাই ছবি জুড়ে আলো এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে চলে ফ্রেম থেকে ফ্রেমে ।আর ছবি শেষের পর এমনিতেই গুন করে ওঠে

         
“ এটা গল্প হলেও পারত ,
একটা আধটা পড়তাম,
খুব লুকিয়ে বাঁচিয়ে রাখতাম তাকে;
            
জানি আবার আসবে কালকে,
নিয়ে পালকি পালকি ভাবনা,
ফের চলে যাবে করে একলা আমাকে।”


মিলে যেতে থাকে আমাদের অনেক অনেক না বোঝা কথা। বুজতে পারি কেন আদিত্যর প্রোফাইল পিকচারে কেউ লিখে ফেলে “ আবার সেই পচা জামাটা পরেছে” কেন আমদের প্রিয় শিক্ষক তার শতছিন্ন ফোন টা এখনও বাদ দিয়ে স্মার্ট ফোন কেনেন না। বুজতে পারি কেন স্বর্নাঙ্ক গঙ্গার দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে বলতে পারে “ ভালবাসা আসলে অনুভুতি যাকে আতর এর মত অনুভব করতে হয়” কেন চুল বড় রাখা সুভঙ্কর এক আকাশ বৃষ্টি মাথায় উন্মাদ এর মত মেট্রো স্টেশনের দিকে ছুটে গিয়েও না ঢুকে ফিরে ঠায় দাড়িয়ে থাকে। কেন আয়ত চোখের জিনিয়া আমাকে মেরে , খিমচি কেটে , শাসন করে , খিস্তি করার পর ,বলে “আজ তোকে টাকা দিতে হবে না আমি খাওয়াচ্ছি” , কেন গভীর রাতে এসএমএস করে বলে “আজ আবার তুই অন্য মেয়েকে ফিল্ম মুভমেন্ট বুঝিয়েছিস? তোকে নিয়ে আর পারি না মৌন” ছবিটি শেষ হয়েও শেষ হয় না চলতে থাকে এভাবেই।


    
বিদেশে গান বা ছবি বানানোর অষ্টমী চলছে এখন বাংলা ছবিতে। সেখানে রাজ চক্রবর্তী ভীষণ সফল ভাবে ধরেছেন মালাদা শহর কে , তার ঐতিহ্যকে, ইমারতকে আসলে এছবি যে শুধু প্রেমের নয় । এতো হালি শহর থেকে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে কোলকাতাতে পাড়ি দেওয়া এক মানুষের ছাপ , ছবি বানানোর লক্ষে যার দিনের পর দিন একটা মেস বাড়িতে বাকি অভিনেতা বন্ধুদের সাথে ঠেসে থাকা। ফলে সেই মানুষ যখন ছবি বানান তাতে গ্রাম বাংলা থাকবেই, নুর ,রিয়া , জয়ী , অভিক এর মত খুব সাধারন অনুভুতি প্রবন রক্ত মাংসের মানুষ রা জীবন্ত হয়ে উঠবেন। আসলে মফস্বল এর মানুষদের যে বন্ধুত্বের কোনও পর্ব নেই , কোনও জাত নেই , ক্যাবলা বা বুদ্ধিমান এর মত ফারাক নেই আসলে বন্ধুত্বে যে এসব হয়না। ধন্যবাদ রাজ চক্রবর্তী কে এমন ছবির জন্য , এছবি যে আমার মত অনেক ছেলেকে সাহশী করে তোলে যারা ভোরের ট্রেন ধরে ছবি বানানোর স্বপ্ন নিয়ে কোলকাতা আসে আর দিনের শেষে সব হাউস ঘুরে কাজ না পেয়ে গভীর রাতের ট্রেনে খিদে পেটে বাড়ি ফেরে, কাল আবার এই ভাবতে ভাবতে।
     

 পরিচালক- রাজ চক্রবর্তী
প্রযোজনা- শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্ম
অভিনয়ে- সোহম, মিমি চক্রবর্তী, আবীর চট্টোপাধ্যায়, পায়েল সরকার , 
যুধাজিৎ ব্যানার্জি   প্রমুখ