সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১২

রিলোডেড অ্যাকসান।

এক থা টাইগার
আগস্ট এর মাঝা মাঝি ছুটির দিনে যদি আপনি একটা মারপিট ,নাচ গানের ছবি দেখতে চান , যদি আপনি আর একটা ভারত পাকিস্তানের প্রেমের মসালাদার ছবি দেখতে চান যার কোনও প্রভাবই শেষে আপনার মধ্যে থাকবে না তাহলে সেই ছবিটি আজ দেখে এলাম । আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যে ছবি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারত তা হারিয়ে গেল ভালবাসার বহু চেনা সেই একই গলিতে। ছবি শুরুর সম্ভবনা টাও খুব ভালো , যত সময় গড়াল তত ভুল বেরিয়ে পড়ল। দেখলাম র এর এজেন্ট টাইগার উত্তর ইরানে আছেন সেখানে এতো চাইনিজ লোক কথা থকে এলো যাদের সাথে টাইগার এর লড়াই হয় এবং ১৩ মিনিট জুড়ে চলতে থাকে আমাদের হিরো প্রতিষ্ঠা পান । এখানে সুন্দর একটা বিদেশী মারামারির ছবির সব্ সুযোগ থাকলেও কেন পরিচালক অকারনে সেই প্রেম এর রাস্তায় হাঁটলেন , সেই হাটা কখনো “ফানা” কখনো “ কাইটস” বা হালফিলের সলমন অভিনীত ছবি গুলির ছায়া ছেড়ে বেরোতেই পারল না । তবে মসালা বলিউড ফিল্মের সব আছে হিরো দারুন জোরে ছোটে , গাড়ি চালায় , বাইক কসরত করে , এমন কি নায়িকাও পাল্লা দিয়ে এসবের সাথে সাথে হেলিকপ্তার ও চালিয়ে ফেলেন ।ছবিটি দেখতে দেখতে বার বার আপনার মনে পড়বে যে সলমন এক সময় একটি ঠান্ডা পানিয়ের বিজ্ঞাপনে এই রকম ভাবেই আমাদের সামনে আসতেন । ছবির মাঝের ১০ মিনিট এবং শেষের ১৫ মিনিট জুড়ে আন্তর্জাতিক মানের মারামারি বাদ দিলে ছবিটি দেখা বেশ কঠিন ।
এখানেই হতাশ হলাম কবির খান এর কাজ দেখে, “ফরগটেন আর্মি” র মত তথ্য চিত্র যার হাত থেকে বেরিয়েছে , তাঁর থেকে এই ছবিটি দুঃখজনক। যদি কাবুল এক্সপ্রেস বা নিউইয়র্ক এর মত ছবি তৈরির মানুষ নতুন কিছুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা (experiment ) না করেন তবে আগামী কিন্তু ভুগবে।

ছবির যান্ত্রিক দিক দেখতে গেলে দামাস্কাস ,ব্যাংকক , আয়ারল্যান্ড এর মত দেশে সিনেমাতগ্রাফি নিজে ছবির একটা চরিত্র হয়ে ওঠার সুযোগ হারাল যথেচ্ছ ক্রমা ও অপ্রয়োজনীয় হ্যান্ডেল শত এর জারকিং এ, যদিও অ্যাকসন এর ক্ষেত্রে ফলোইং শট আন্তর্জাতিক মানের । কিন্তু এটা একটা ছবির অলঙ্কার হতে পারে , ছবির কথা বলে না ।

অর্থনৈতিক ভাবে এছবি বেশ ভালো বাজেটের ৭০ কোটির এবং ব্যাবসা করেছে প্রথম দিনেই ৩৩ কোটি ফলে বোঝায় যাচ্ছে এ আর একটি বাণিজ্যিক ভাবে সফল অথচ নিন্ম মানের ছবি কে আমরা দেখলাম সুধুমাত্র স্টার এফেক্ট দিয়ে পার হয়ে যেতে। শেষে যে আশা নিয়ে আমারা অপেক্ষা করতে পারি যে কবির খান এই কাচা দরের ছবি থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসবেন এবং আমাদের আবার সময় এর কথা বলে এমন ছবি বানাবেন।



ডিরেক্টরঃ কবির খান । প্রোডিউসারঃ আদিত্য চোপড়া । অভিন্যঃ সলমন খান , ক্যাটরিনা কাইয়ফ , রনবির সুরি সিনেমাটগ্রাফিঃ অসীম মিশ্র । মিউজিকঃ সোহেল সেন , সাজিদ- ওয়াজিদ।

বৃহস্পতিবার, ৯ আগস্ট, ২০১২

মেঘ সরিয়ে বৃষ্টি আসে......তারায় ঢাকা বেড়ার ঘরে।।


ঋত্বিক কুমার ঘটক, একটা প্রতিস্টান, একটা বিষয়।  গোটা জীবন দিয়েও হয়ত তাকে বোঝা অসম্ভব। যেমন অসম্ভব তাঁর গোটা একটা ছবি কে নিয়ে লেখা। তাই ও পথে আমি আর গেলাম না। আমি তাঁর ছবির ছোটো

একটা দৃশ্যের কথা বলি। "মেঘে  ঢাকা তারা" ঋত্বিক বাবুর চতুর্থ ছবি। যে ছবিটা হয়ত প্রত্যক্ষ ভাবে বা পরোক্ষ ভাবে প্রত্যেক বাঙালীর কথাই বলে। ছবিতে রবি ঠাকুরের ব্যবহৃত গান "যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে"  এর দৃশ্যায়নে যে গুঢ় অর্থ লুকিয়ে আছে তার আলোচনাই এ লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য।
 ছবির মূল ভাবধারায় না গিয়ে যদি মাত্র শুধু দেবব্রত বিশ্বাস ও গীতা ঘটকের কণ্ঠে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের সঙ্গীত পরিচালনায়   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  গানটির দৃশ্যায়নে যাওয়া যায় তাহলে আমরা প্রথমত সমগ্র গানটির দৃশ্যে দুটি চরিত্রকে দেখতে পাই। চরিত্রগুলির নামাকরনে যদি যাওয়া যায় তাহলে একজন ছবির প্রধান প্রতিনিধি "নীতা" আরেকজন তাঁর দাদা "শঙ্কর"। অভিনয়ে সুপ্রিয়া দেবী ও অনিল    ।
গানটির শুরুই হয় নীতার সংলাপ দিয়ে " দাদা আমায় গান শেখাবি.........বাসর ঘরে গান গাইতে হবে যে।" সংলাপ শেষের সাথে সাথেই গান শুরু হয়।
প্রথম শট    ক্লোস আপ শঙ্কর ওরফে নীতার দাদার। ক্যামেরা স্থির এক জায়গায়। গান শুরু হয়। "যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে।" প্রথমে শঙ্কর মাথা নীচু করে চোখ বন্ধ করে গান শুরু করে। তারপর মুখ ফিরিয়ে নেয়। এখানেই এই দৃশ্যের শেষ হয়।
               এই দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই শঙ্করের ক্লোস আপ শট্ নীতার দৃষ্টিকোণ (পয়েন্ট অফ ভিউ)  থেকে। আমরা বুঝতে পারি না তারা কোথায় আছে, তাঁদের অবস্থান কি। খুব অন্ধকার ঘরের অবস্থা, প্রায় কিছুই দেখা যায় না। শঙ্করের মুখ একদম পর্দার ডানদিকে, তাঁর চাহনি বাঁদিকে। একমাত্র তাঁর মুখের ওপর হাল্কা আলো, আর তাঁর পিছন থেকে হাল্কা আলোর একটা রশ্মি আসছে যাতে মাথার চুলের অংশবিশেষ উজ্জ্বলিত।
দ্বিতীয় শট      মিড ক্লোস আপ শঙ্করের। ক্যামেরার স্থান বদল হয়েছে। পর্দায় শঙ্করের অবস্থানও পরিবর্তন হয়েছে। ডানদিক এর পরিবর্তে এখন সে  বাঁদিকে। এক্ষেত্রেও ঘরে তাঁর অবস্থান বোঝা যায় না।
শঙ্করের মুখের কিয়দংশ হাল্কা আলোয় উজ্জ্বলিত। তাঁর সামনে একটা হ্যারিকেন। এবার বোঝা যায় তাঁর পিছনে বেড়া আছে। বেড়ার ছোটো ছোটো ফাকা দিয়ে হাল্কা আলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাতে কিছুই পরিবর্তন হয়নি শুধু আলোর অনুপ্রবেশ বেড়ার অস্তিত্বকে প্রমান করেছে।
এরপর শঙ্কর এর ঘাড় ঘোরানোর সাথে সাথে ক্যামেরারও পর্দার ডান দিক থেকে বাঁদিকে পার্শ্বপরিবর্তন হয়। পার্শ্বপরিবর্তন এর মাধ্যেমে নীতা ও শঙ্কর একই ফ্রেমে আসে, এরপর নীতার মিড ক্লোস আপ এ এসে ক্যামেরা স্থির হয়। নীতার মুখের কিয়দংশ মনে হচ্ছে দূর থেকে আসা হাল্কা আলোয় উজ্জ্বলিত। তাঁর ঘাড় ঘোরানোর সাথে সাথে তাঁর মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় এবং ঘাড়ের অংশটি সেই আলোয় উজ্জ্বলিত হয়। পুরো ঘর জুড়ে অন্ধকার শুধু নীতার ঘাড়ের ওপর আলো আর তাঁর ডানদিকের বেড়া দিয়ে আলো ঢুকে তার অস্তিত্ব প্রমান করছে।  
এই অংশে নীতার ঘাড়ের ওপরই আলো ফেলা বাকিটা অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে পরিচালক কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাধারনত আমাদের মত ছাপোষা বাঙালীদের সারা জীবনেও ঋত্বিক কুমার ঘটককে জানা সম্ভব নয়। তাই আমরা নিজেদের আভিজাত্য ফলানোর দায় সর্বসমক্ষে বলে দিই “ও আবার কী জন্য এমনিই করেছেন। বেশী টাকা ছিল না তাই অমন অন্ধকারই রেখেছেন, আলোর ব্যবস্থা করতে পারেন নি হয়ত।" ওহে আমার অতি মূর্খ বন্ধু ছবি দেখা আর ছবি পড়া দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। বিস্তর বিদেশী ছবি দেখলেই আর বিদেশী তারকার নাম জানলেই যদি ছবি বোদ্ধা হওয়া যেত তাহলে সারা কলকাতায় এর সংখ্যা অনেক হত।  তাই যারা কিছু হবে না কিছু ছিল না বলে দাবি করে তাদের কাছে অনুরোধ দয়া করে এ কথা বলবেন না, আগে বাংলা ইতিহাস জানুন আগে বাংলা ছবি বুঝুন তারপর অতি বড় চালাকের মতন মন্তব্য করবেন। আগে ছবির ভাষা বুঝুন মন্তব্য না হয় নাই করলেন।
ছবির শুরুর দৃশ্য ও শেষের দৃশ্য এর তুলনা করা যায় তাহলে আমরা দেখতে পারি যে নীতার আগমন কোথা থেকে আর প্রস্থান বা বিসর্জন কোথায় হয় তা আমরা জানি না।  নীতাকে তাই এখানে এক ঐশ্বরিক রূপের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর আমাদের বাঙালীদের কাছে নারী রুপী ঈশ্বর বলতে দেবী দুর্গার কথাই আগে ভেসে আসে। পরিচালকের কল্পনারুপী দেবী দুর্গা হল নীতা।
এ সত্য প্রমান করার জন্যেই পরিচালক এ দৃশ্যে নীতার গলার ওপরই শুধু আলো ফেলে। তাঁর গলার ওপর আলো ফেলার যে যৌক্তিকতা তা দেবী মূর্তি কে প্রতিস্থাপিত করে। মূর্তি গড়ার সময় মুখ থেকে গলার অংশটুকু ছাঁচে ফেলে করা হয়। দেহটুকু আলাদাভাবে গঠন করে ধড়ের ওপর বাকি অংশটুকু বসিয়ে দেওয়া হয়।  তুলনামুলক ভাবে তাই সাধারন মানুষের থেকে মূর্তির গলার অংশের দৈর্ঘ্য বেশী হয়। তাই নীতার গলার অংশের উজ্জ্বল রাখার পিছনে এ সত্যই প্রকট হয় যে পরিচালক এখানে নীতাকে তুলনা করেছেন দেবীমূর্তির সাথে।  
তৃতীয় শট      এটা নতুন করে নেওয়া কোন শট নয়। আগের শটেরই দীর্ঘাইকরন। ক্যামেরার স্থান পরিবর্তন হয়। ক্যামেরা যেখানে ছিল সেখান থেকে দুজনকে একই ফ্রেমে এনে ট্র্যাক ব্যাক করে এবং অনেকটা দূরে এসে স্থির হয়। দূরে নীতা ও শঙ্কর বসে আছে তাদের ওপর হাল্কা আলো শুধু তাদের অস্তিত্ব প্রমান করছে। ক্যামেরার ফোকাস তাদের ঘরের ছাদের ওপর। সিলিং এ হাল্কা আলো প্রতিফলন করে ফেলা হয়েছে। আমাদের কাছে এইবার তাদের ঘরের অবস্থাটা পরিস্কার হয়। এতক্ষণ বাদে আমরা বুঝতে পারি তাদের শারীরিক অবস্থানটা কোথায়।
ক্যামেরা কিছুক্ষন স্থির থাকার পরেই আবার ট্র্যাক ইন করে একই ফ্রেমে দুজনকে রেখে স্থির হয়, দুজনের মিড ক্লোজআপ শটে।
চতুর্থ শট    এই দৃশ্যটাই অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। কেন এই দৃশ্যে নীতার এক্সট্রিম ক্লোজআপ শট নেওয়া হল এবং নীতা ছাদের দিকে তাকিয়ে গান গাইতে লাগল।
পরিচালকের কৃতিত্ব সেখানেই যেখানে একটা ছবি পরিচালকের কল্পনাপ্রসূত হয়ে তা সক্ষম রূপ নেয় এবং তা স্বয়ং পরিচালকের ছবি হয়ে দাড়ায়।
 মেঘে ঢাকা তারায় এই দৃশ্য কোথায় পরিচালক বুঝিয়ে দেননি,এখানে তিনি তাঁর কল্পনাকে বাস্তবায়িত করেছেন। ছবিটা শুরু থেকে দেখলেই বোঝা যায় এই অংশে এসে নীতার বিসর্জন ধীরে ধীরে আসতে চলেছে। তাই বিসর্জনের সমতুল্য কিছু দৃশ্যায়িত করার জন্যেই এই দৃশ্য।
নীতার ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা প্রতিমা বিসর্জনের সময় যখন নদীবক্ষে প্রতিমাকে ফেলা হয় সেই সময় শুধুমাত্র তার মুখমণ্ডলীটাই জলের ওপরে ভেসে থাকে বাকীটা ডুবে যায়, এই দৃশ্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
দেবী প্রতিমা যেমন কিছুদিনের জন্যেই আমাদের কাছে আসেন তেমনি নীতার জার্নিটাও কিছুটা সময়ের। ছবিতে পরিস্কার হয় না নীতার এর আগে কি ছিল, নীতারে এর পর কী হবে। আমরা জানতে পারি না নীতার শেষে কী হয়। দেবী প্রতিমার মতই নীতার আগমন ও বিসর্জনের কথা আমাদের কাছে রহস্যাবৃত থেকে যায়।
পঞ্চম শট  শঙ্করের মিডক্লোজ আপ, তাঁর মুখের ওপর হাল্কা আলো, পর্দার বাঁদিকে তাঁর চাহনি। শঙ্কর গান থামায় কিন্তু নীতা তখনও গান গেয়ে চলে, শঙ্কর তাঁর মুখের দিকে তাকায়, এইখানেই এই শট শেষ হয়।
ষষ্ট শট   নীতা এই দৃশ্যেও আগের মত ওপরের দিকে চেয়ে থাকে এবং তাঁর পিছনে ঝাপসা দুটো আলোর উৎস উজ্জ্বলিত হয়ে থাকে।
এই দৃশ্যেও আরও পরিস্কার ভাবে নীতাকে দেবীরূপে দৃশ্যায়িত করা হয়েছে তাঁর পিছনে দুটো উজ্জ্বল আলোর উৎস দিয়ে। দেবীর পিছনে যেমন একটা আলোর উৎস তাঁর দৈবিক রূপকে প্রকাশিত করে থাকে তেমনি এখানেও নীতার পিছনে একটা আলোর উৎস তাঁর সাথে দেবীর তুলনাকে আরও দৃঢ় ভাবে প্রকাশিত করে।
এখানেই এই গানটির শেষ হয়। গানের শেষ দুই লাইনের সাথে সাথে চাবুকের শব্দ ও ভেসে আসে। ঋত্বিক বাবুর ছবিতে এই শব্দ এর প্রয়োগ যে কতটা গুঢ় অর্থবহন করে তাঁর আলোচনা অন্য আরেকদিন করব আজ এইটুকুই থাক।
পরিশেষে ধন্যবাদ সেই সমস্ত মানুষদের যাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ছাড়া এই লেখা অসম্ভব ছিল।
ধন্যবাদ।। 

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই, ২০১২


অপুর দর্শন



অপারিজিত ১৯৫৭ তে সত্যজিৎ রায় এর ছবি। আমার অনুভুতিতে ভারতের চিরকালের আধুনিক ছবির শেষ কথা । 
বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালি থেকে পরিচালক কিছু অংশ নিয়ে নিজের মত করে ভারতীয় সমাজ কে তুলে ধরেন পৃথিবীর সামনে। পথের পাঁচালি , অপারাজিত , অপুর সংসার । অপু নামের এক জীবনের চলার কাহিনী ক্রমশ বদলে গেল জীবন দর্শনে।
  

ছবির পটভূমি অনুযায়ী বাংলা ১৩২৭ সন প্রায় ৯০ বছর আগের এক গ্রামীণ বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারের বালক এর আধুনিক জীবন খোঁজের সফর । এ আধুনিকতা কেবল শরীর বা পারিপার্শ্বিকতার নয়, এতো অন্য চলা যেখানে সব কিছু ছাড়িয়ে উঠে আসে মানুষ । তাই কাশী থেকে ফিরে আসতে হয় পিতাহীন অপুকে অন্তত পূজা করে সংসার চালাতে পারবে এই আশায়। বাংলার মাটিতে সর্ব প্রথম সে দেখতে পারে সেই রেলগাড়ি , আধুনিক পৃথিবীর গতিময় জীবনের নিদর্শন। সকালে পূজা চলতে থাকে কিন্তু সে মাকে জানায় “ মা আমি স্কুলে পড়ব ?” শুরু হয় বিজ্ঞান ভিত্তিক চলা, ক্রমশ পরিচিত হতে থাকি আমরা বাইরের বিশ্বের সাথে ।



এই আধুনিকতা বাস্তবিক হয়ে ওঠে ছাত্র অপুর মেধা আর জ্ঞান এ। এস্কিমো , থেকে আফ্রিকা , গ্যালিলিও থেকে পাস্কেল এ জানা তো বস্তুত বিশ্বের খবর জানা । অজ পাড়াগাঁয়ের বালক অপু যখন হ্যারিকেনের আলোতে সূর্য গ্রহণ কি? এর উত্তর পরীক্ষার মাধ্যমে বর্ণনা করে তখন ভারতীয় সমাজের কুসংস্কারের শাপমুক্তি ঘটে এ ছবিতে। স্কুল ফাইনাল এর পর কলকাতা যাওয়ার প্রস্তাব মুখমুখি দাড় করায় সম্পর্ক আর উন্নত জীবন কে। গ্লোবে কলকাতা খোঁজা তো নাম এর বাইরে ভূগোল কে খুজে দূরত্ব মেপে নেওয়া । মা কে ছেড়ে সেই রেলগাড়ি তে কলকাতা তো আবেগ এর মধ্যে থেকেও বার বার বধ্য জীবনকে প্রশ্ন করে আর কত রাস্তা গেলে মানুষ নিজের কাজ বুঝতে পারবে । প্রথম চিঠি তে তার ঘরে যে বৈদ্যুতিক বাতি আছে মাকে জানায়।




এই আধুনিক চিন্তা, মনন , দৃষ্টি এর আগে আর কোনও ভারতীয় ছবি তে দেখা জায়নি । জন রেনয়া বলে গেছিলেন “ তোমাদের ছবির নিজস্ব ভাষা যদি খুজে না নিতে পার তবে সেই ছবি কোনদিন চিরকালীন হবে না ” এর আগে ছিন্নমূল বা তারও আগে বিদ্যাপতী তে আভাস পাওয়া গেলেও পথের পাঁচালি থেকে অপারাজিত তে প্রতিষ্ঠা পায়।



আধুনিকতা মানে নিজস্বতাকে বিসর্জন নয় ,


“কোন ভাষা মরমে পুষি আকূল কোরে তোলে প্রাণ,
কোথায় গেলে শুনতে পাবো বাঊল সুরে মধুর গান ” 

ছাত্র অপুর পাঠে খুশি হেড স্যার, সেই কারনেই ছবিতে অপু শহর থেকে ফিরে পুকুরে স্নান করে , সূর্য ঘড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়াতে পঞ্জিকা তে সূর্যউদয় এর সময় দেখে, ইচ্ছা করে ট্রেন ছেড়ে মা‘র কাছে ফিরে আসে।


তবে কোনও কিছু কে অর্জন করতে গেলে নিজস্বতা কে কিছুটা হলেও বিসর্জন দিতে হয় , ছবি তে অপুর সাথে ক্রমশ মা এর সম্পর্ক শীতল হয় , মানসিক দূরত্বের হিসাব “ ও কিছু টাকা মানিঅর্ডারে পাঠিয়ে দিয়েছি” মেলে না। পরিচালক পারতেন খুব সহজ ভাবে মা ও ছেলের মিল করিয়ে দিতে কিন্তু সেখানে আর এই বাস্তব টা থাকত না। এটাই শিক্ষা , দর্শন যা এ ছবি কে চিরকালীন করেছে। শেষ দৃশ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির বেতের পাত্র যা অপুর মা ব্যাবহার করতেন এবং অপুর আধুনিক পৃথিবীর গ্লোব কে একই সাথে বেধে মা , বাবা হীন কিশোর এর কলকাতা যাত্রা তো আধুনিকতা আর নিজস্ব সংস্কৃতিরএকসাথে পথ চলার শুরু। এবং এ সফরে কোথাও বধ্যতা নেই , কূসংস্কর নেই ।


আবহ সঙ্গীত , ক্যামেরা , লাইট বা অভিনয় নিয়ে বলার ধৃষ্টটা আমার নেই। এ যে জীবনদর্শন।

বৃহস্পতিবার, ১২ জুলাই, ২০১২

গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর--সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যের উন্মোচন।।







আমরা যারা সহজে মেনে নিই সত্যকে আমরা । যারা সত্যকে বিচার করি না, তাকে যাচাই করি না, শুধুমাত্র মেনে নিতেই শিখেছি, তাঁদের কাছে উৎসাহ উদ্দিপনা সবই হারিয়ে যায় আসল সত্যের আড়ালে, যখন সত্য বলতে কোন একটা বিষয় কে বোঝায় না অনেক গুলি বিষয়ের মেলবন্ধনকে বোঝায় ।  সত্য কখনও একটা হতে পারে না, সবসময়ই তা একের অধিক হ্য়। আর সেখানেই গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর এর নিজস্বতা কোন একটা সত্যের উন্মোচন করতে গিয়ে একের অধিক সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ বরাবরই একটু ভিন্ন স্বাদের ছবিই পরিচালনা করেন। আর তাই তাতে বলিউডের ট্রেডমার্ক থাকে না। তাই এই ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস' ফোর্টনাইট বিভাগে প্রদর্শিত হওয়ার পর এক সমলোচককে বলতে হয় এই ছবি ভারতীয় সিনেমাতে এক নতুন দিশার উন্মোচন করল।


আমাদের ছবির জগতে গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর নিছক একটা ছবি হয়ে থাকবে শুধুমাত্র তার গল্পের জন্য নয়, গল্পের ব্যবহারিক করন, গল্পে চরিত্রের প্রয়োগ, গল্পের মাধ্যমে তথ্য প্রদান সবকিছু মিলে।

তাই বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ধানবাদ শহরের অনতিদূরে অবস্থিত ওয়াসেপুর যখন মানচিত্রে থেকেও আমাদের মনে থাকে না, সেই একটা জনপদের গল্প  গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর। যে স্বাধীনতার প্রাক্কাল থেকেই অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। 

পরিচালক এক বিরাট সময়ের কথা এখানে বলতে চেয়েছেন যেখানে সময়টা স্বাধীনতার আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ভারতবর্ষের অন্যতম খনিজ সম্পদ "কয়লা" এর খনির জন্য বিখ্যাত ধানবাদ ও তার আশেপাশের অঞ্চল খনির সাথে সাথে খুনিদের ও দেখে এসেছে।

একটা জনপদ যেখানে দুটি গোষ্টি যাদের কাজ এর থেকে কুকাজই বেশী। তারা মালবাহী রেলগাড়ি থামিয়ে লুট করেই প্রধানত লুটের সাম্রাজ্যে লুটতরাজ হয়। এ হেন এক লুটতরাজ শাহিদ খান। যে শত্রু পক্ষের হাত থেকে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে সংসার নিয়ে বাসস্থান ত্যাগ করে । সময় পাল্টায় কিন্তু নতুন দিন ও কালো মুখোশ পরে নেমে আসে।  তাই মনোজ বাজপায়ি ওরফে সর্দার খানকে তাঁর বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার পালা শুরু করতে হয় অনেক ছোটো থেকেই কেশহীন হওয়ার সুচনার সময়কালে।

একটা বিশাল সময়ের কথাকে বলতে গিয়ে, একটা প্রকাশ্য আলোয় না আসা সামাজিক বিষয়ের কথা বলতে গিয়ে পরিচালক এই ছবিতে প্রচুর চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন। যেখানে প্রতিটা চরিত্রের চলনের মাধ্যমে আমরা একটা ইতিহাসের কথা জানতে পারি, একটা স্বাধীন দেশের সাম্রাজ্যবাদী লুটতরাজদের কথা জানতে পারি।

ঐতিহাসিক গল্প সৃষ্টির মাধ্যমে গল্পের চরিত্ররাও তাই ঐতিহাসিক হয়ে উঠেছে। একটা কয়লাখনির পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, কয়লা মাফিয়াদের বেহায়াপানা, দখলদারির জন্য খুন, জেল থেকে পালানো- সবই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম অবধি অতিবাহিত হয়। তাই কোন এক আঙ্গিকে গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর এক কাব্য হয়ে ওঠে, মহাকাব্যিক আখ্যানে হয়ত না দেওয়া গেলেও কোন অর্থে   গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর শুধু মাত্র একটা গল্প হয়ে থাকবে না।

মহাকাব্য হয়ত হয়ে উঠলেও উঠতে পারত যদি তা সর্বাগ্র ভাবে কোন পক্ষকে বিরোধী পক্ষ ঘোষণা করত, তাহলে হয়ত আমরা ও আমাদের দূরদৃষ্টিতে খুজে পেতাম মহাকাব্যের নায়ককে। জার দুঃখে হয়ত আমরাও কেঁদে উঠতাম, যার রাগে হয়ত আমরাও তাঁর বাবার খুনের বদলা নিতে তাকে সাহায্য করতাম। তাই এখানেই এই ছবি আর পাঁচটা ছবির থেকে আলাদা, মহাকাব্যের দর্শনের নীতিমূলক কাঠামোর বাইরে।

তাই মনোজ বাজপায়ির বাবার মৃত্যুতে তাঁর মত আমার কান্না পায় না, তাঁর হাতে আমিও চাই না বন্দুক উপহার দিতে, কিন্তু সেও যে বদলার আগুনে ফুটছে, তা আমার কাছে পরিস্ফুট হয় না। তাই তাঁর বদলার আগুন আমার হৃদয় কে স্পর্শ করে না।

আলাদাভাবে অনুরাগ বাবুর সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে বলার কিছু নেই, বারে বারেই আমরা দেখে এসেছি তাঁর ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আর পাঁচটা বলিউডের ছবির থেকে আলাদা। ডার্ক ইমেজ ব্যাবহার করার তীব্র প্রবণতাই তাঁর ছবিকে আর পাঁচটা হিন্দি ছবির থেকে আলাদা করে তুলেছে।

ছবির সঙ্গীত ও আবহসঙ্গীত নিয়ে আলাদা করে বলতেই হবে কারন ছবির মধ্যে মহাকাব্যিক উপকরন হিসাবে সঙ্গীত একটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। লোকগীতির কথা লোকায়ত সঙ্গীতের পূর্ণ ব্যবহার ছবিটাকে তার পরিচালিত বৃত্তের বাইরে বেরতে দেয় নি। তাই এটা শুধু ওয়াসেপুরের কাহিনী হিসাবেই রয়ে গেছে। আর তাই কোন একটা জনপদের কাহিনী দেখতে দেখতে আমি ও আমার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথেও মিল খুজে পাই।
আমি অনুভব করতে পারি আমার পরিচিত নরেন দার কথা, যার ছোট একটা টেলরের দোকান ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল সামাজিক মাফিয়ারা, শুধুমাত্র তাঁদের না জানিয়ে দোকান ঘরটি কেনার জন্যে।

মাফিয়াবৃত্তি আমাদের দেশের কলকব্জাকে চিরদিনই গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথাই ভাবে, তাই হয়ত ১৯৪১ ের কয়লা মাফিয়ার ওয়াসেপুর এখন চরম অন্ধকারেই তলিয়ে আছে, তা না হলে বেনারসে ছবির শুটিং এঁর সময় ছবির সহপরিচালক সোহেল সাহ এর আকস্মিক মৃত্যুও কোথাও গিয়ে খুনের ইঙ্গিত বহন করে।

তাই ওয়াসেপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ কোথাও গ্রাহ্য হয় না, ছবিতে সেন্সরের কাঁচি চলে না। আধির আগ্রহে তাই অপেক্ষা করছি ছবির দ্বিতীয় অংশটির জন্য। সেখানেই হয়ত কাব্য নিছক কাব্য না হয়ে মহাকাব্যিক আখ্যান হয়ে উঠবে।।