শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ভালবাসা আর "বরফি"- বরফ গলে পুরো জল





আমরা যারা মানুষ যারা মানুষের মত আচরন তারা সবাই হয়ত মনে মনে মানি বা জনে জনে বলি ভালবাসা দেশ কাল সীমানা মানে না ভালবাসা একটা অনুভুতি সেটা শুধু অনুভব করা যায়। ভালবাসার রূপ নেই গন্ধ নেই ভাষা নেই, ভালবাসা নিস্চুপ। অনুরাগ বাসুও হয়ত আমাদের আবার বললেন ভালবাসার কোন ভাষা হয় না। ছোটবেলায় জন্ম লগ্নে মা মারা যাবার পর বাবা মূক ও বধির ছেলের নাম রাখেন মরফি। কালক্রমে সেটাই হয়ে যায় বরফি। সেই সিনেমা আবিস্কারের আদি পর্বে যখন সিনেমার কোন শব্দ ছিল না কোন সংলাপ ছিল না আজকের দিনে এসেও মনে হয় পরিবেশ আর অভিনয় থাকলে সেখানে আজও বেশী সংলাপের প্রয়োজন হয় না। আমার বারবার মনে হয় সেই নেপোলিয়নের কথা -যুদ্ধের প্ল্যান যদি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলেই যুদ্ধ প্রায় হয়ে গিয়ে থাকে তেমনি সিনেমারও যদি চিত্রনাট্য লেখা হয়ে যায় তাহলে সিনেমাও প্রায়ই হয়ে গিয়ে থাকে। সবাই তো আর ঋত্বিক কুমার ঘটক না যে চিত্রনাট্য মাথায় নিয়ে ঘুরবে। জমাটি চিত্রনাট্যই একটা ভাল ছবির উপহার দেয়। যেমন অনুরাগ বাসু পরিচালিত রনবির কাপুর, প্রিয়াঙ্কা চোপরা, এলিনা ডিক্রুজ অভিনীত “বরফি”। এক বাক্যে যদি সিনেমার গল্প বলতে হয় তাহলে এটাও আর পাঁচটা বলিউডের সিনেমার মত ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনী। কিন্তু একটা গল্পকে প্রদর্শন করার আঙ্গিক তার ভঙ্গিমা বদলে দেয়। একটা অদ্ভুত ন্যারেটিভে বেঁধেছে গল্পটাকে লেখক অনুরাগ বাসু। তিনটে সময়কে তুলে ধরা হয়েছে ১৯৭২,১৯৭৮ ও আজকের দিন। কিন্তু কোথাও ছবিটা একটা লিনিয়ারিটিকে ধরে এগিয়ে যায় নি। একটা সময়ের মধ্যে আর একটা সময় ঢুকে পড়েছে। আবার কোথাও দুটো সময়কে সমান্তরাল ভাবে দেখানো হয়েছে। খুব কঠিন একটা ন্যারেটিভ এর ধরন বহুদিন বাদে বাণিজ্যিক হিন্দি ছবিতে নজর এল।
হাসির মোড়কে একটা প্রেমের গল্প দেখা গেল। যেখানে দেখতে দেখতে বারবার একজনের কথাই মনে পরছিল তিনি মহর্ষি চ্যাপলিন। কিভাবে নিজের শরীরকে ব্যাবহার করে বিন্দুমাত্র সংলাপ ছাড়া অভিনয়কে তুলে ধরা যায় রনবির আবার সেটা করে দেখালেন। দার্জিলিঙয়ের পটভূমিতে ছবির গল্প এর প্রধান উৎস হলেও মাঝে মাঝে সে পাহাড় ছেড়ে সমতলে নেমে এসেছে। কখন বা বাংলার সবুজ গ্রাম কখনও বা কলকাতা।
দার্জিলিঙে আসা সুন্দরী শ্রুতি এর প্রেমে পরে বরফি যখন হাবুডুবু তখন তাঁর প্রেমেও শ্রুতি মাঝ সমুদ্রে সাঁতরে যাচ্ছে। কিন্তু মানবিক দ্যোতনাকে কখন সে পরিত্যাগ করতে পারে নি তাই কখনই পারে নি একজন প্রতিবন্ধীকে আপন করে নিতে। ছবির শুরুতেও পারে নি শেষেও পারেনি। তাই একসময় এসে তাকে আক্ষেপ করতে হয় “আমারা যারা সম্পূর্ণ তারা তাদের ভালোবাসার পূর্ণতা পায় না কিন্তু বরফি নিজে সম্পূর্ণ না হয়েও সম্পূর্ণ ভালবাসা পায়।” এই সম্পূর্ণ ভালবাসাই আসলে ঝিলমিল রুপী একজন মানসিক রুগী প্রিয়াঙ্কা চোপরা। যাকে পরিবার চিরকালই তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল শুধুমাত্র তাঁর নামে হয়ে যাওয়া তাঁর দাদুর সম্পত্তির জন্য, এই ঝিলমিলকে নিয়েই বরফি পাড়ি দেয় কলকাতা। অনবদ্য এক প্রেমের কবিতা লিখেছেন এ পর্যায়ে অনুরাগ। দুই প্রতিবন্ধীর ভিতরকার আবেগ তাদের ভালবাসা যে আমাদের সাধারন সুস্থ মানুষের থেকে কতটা আলাদা তাই যেন এ কবিতায় লেখা।
এই ঝিলমিলকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বড় অদ্ভুত, এর আগে তাই রনবিরকে কখনও কিডন্যাপার হতে হয় তো কখন ব্যাঙ্ক লুটেরা। ঝিলমিলের চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা সত্যিই অনবদ্য এককথায়। আবারও “সাতখুন মাফ” এর পর তিনি বোঝালেন তিনি কেন বাকিদের থেকে আলাদা। পুলিশ অফিসারের চরিত্রে সৌরভ শুক্লা, যার ভাষায় আমরা গল্পের অনেকটা শুনি, তিনিও অসাধারন।
ছবির শুরুতে একটা প্রেম আর শেষের দিকে একটা প্রেম, দুইয়ের পটভূমিকাটা আলাদা দুইয়ের পরিবেশটা আলাদা। এই দুই প্রেমের ক্ষেত্রে কোথাও যেন পরিবেশ একটা তৃতীয় চরিত্র হতে পারত কিন্তু এই তৃতীয় চরিত্রটির বড় অভাব যে চোখে পড়েছে তা অনুরাগ বাবু নিজেই বলেছিলেন “বেশ কিছুদিন আরও ইচ্ছা ছিল এখানে (দার্জিলিং) শুটিং করবার কিন্তু হল না”। তাই এই দায়ভার থেকে নিজেকেও দূরে সরিয়ে রাখা যায় না, আমার শহর আমার রাজ্য আজ আর আমার নয় এখানে আমি কোন কাজ করতে গেলে সকলের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
তাই যে দার্জিলিং কে আমরা চিরকাল তাঁর সুরভিত গন্ধের তাগিদে তার রুপময় রূপ দেখে এসেছি। বরফি এসে কোথাও সামান্য পরিমানে এই রূপের অন্তরে ঢুকে পরে, আর তাই আমরা মাথাভাঙ্গার কোন এক নেপালি গ্রাম কে দেখতে পাই, ছৌ নাচ দেখতে পাই। হয়ত প্রথমবার এমন একটা বাণিজ্যিক হিন্দি ভাষার ছবিতে ছৌ নাচ
এর অংশগ্রহণ আমাদের মনে বাড়তি উৎসাহ সৃষ্টি করে যার জন্য অবশ্যই অনুরাগ বাবুর একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। আর একজন এর কথা এখানে বলতেই হয় তিনি সঙ্গীত পরিচালক প্রীতম। প্রতিটা মুহূর্তকে সঙ্গীত যেন আলিঙ্গন করে রয়েছে। যেমন আবার সেই “লাইফ ইন আ মেট্রো” এর মত তিনজন মানুষ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যায় আর পুরো গল্পটাকে একটা মিউজিক্যাল মুড দেওয়ার চেষ্টা করে। সত্যিই সঙ্গীত ও আবহ সঙ্গীত এদিক সেদিক পরে থাকা টুকরো টুকরো মুহূর্তকে একনিষ্ঠ করে পুরো গল্পটাকে পরিবেশন করেছে।
শেষত বলতেই হবে পশ্চিমবাংলার উত্তাল সময়ের একটা মিষ্টি প্রেমের গল্প বলতে গিয়ে ছবি কখনই এই গল্পের বাইরে বেরিয়ে পরে চারিপাশের পরিবেশের সাথে জড়িয়ে পড়েনি। শুধুমাত্র জ্যোতি বসুর দেওয়াল চিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রতিটা মুহূর্ত খুব যত্ন সহকারে বোনা হয়েছে তাই বরফি অসংখ্য মুহূর্তের মেলবন্ধনের গল্প। যেখানে আবার বলতে হয় মুহূর্ত কে অনুভব করার জন্য তাকে বোঝার জন্য ভাষার প্রয়োজন হয় না, যেমন আমরা সাংকেতিক ভাষা না জেনেও বরফির ভাষাটা বুঝতে পারি।
আমার বারবার ছবিটি দেখতে দেখতে একটা কথাই মনে হচ্ছিল মাখন জ্যেঠুর ছেলে সুবোধদার কথা। সুবোধদাও কথা বলতে ও কিছু শুনতে পায় না। মাখন জ্যেঠুর অবস্থা খুব একটা ভাল নয় তাই ছেলেকে শোনার মেশিন কিনে দিতে পারে নি। মারা যাবার কিছুদিন আগে ছেলের বিবাহ দিয়ে গিয়েছিল। পুত্রবধূও মূক ও বধির। কিছুদিন আগে আমাদের বাড়িতে এসেছিল ১০ মাসের ঋষভ সাথে নিয়ে। খুব মিষ্টি দেখতে হয়েছে ওদের ছেলেটাকে। তাই বারবার মনে হচ্ছিল একমাত্র ভালবাসাই পারে অসংখ্য অসম্পূর্ণতার মাঝেও নিজেদের একে ওপরের প্রতি ভালবাসা খুঁজে নিতে।
ছবিঃ বরফি
অভিনয়ঃ রনবির কাপুর, প্রীয়াঙ্কা চোপরা, ইলিনা ডীক্রুজ, সৌরভ শুক্লা, আশিস বিদ্যার্থী, জিশু সেনগুপ্ত, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।
সঙ্গীতঃ প্রীতম
চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনাঃ অনুরাগ বসু   

সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১২

রিলোডেড অ্যাকসান।

এক থা টাইগার
আগস্ট এর মাঝা মাঝি ছুটির দিনে যদি আপনি একটা মারপিট ,নাচ গানের ছবি দেখতে চান , যদি আপনি আর একটা ভারত পাকিস্তানের প্রেমের মসালাদার ছবি দেখতে চান যার কোনও প্রভাবই শেষে আপনার মধ্যে থাকবে না তাহলে সেই ছবিটি আজ দেখে এলাম । আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যে ছবি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারত তা হারিয়ে গেল ভালবাসার বহু চেনা সেই একই গলিতে। ছবি শুরুর সম্ভবনা টাও খুব ভালো , যত সময় গড়াল তত ভুল বেরিয়ে পড়ল। দেখলাম র এর এজেন্ট টাইগার উত্তর ইরানে আছেন সেখানে এতো চাইনিজ লোক কথা থকে এলো যাদের সাথে টাইগার এর লড়াই হয় এবং ১৩ মিনিট জুড়ে চলতে থাকে আমাদের হিরো প্রতিষ্ঠা পান । এখানে সুন্দর একটা বিদেশী মারামারির ছবির সব্ সুযোগ থাকলেও কেন পরিচালক অকারনে সেই প্রেম এর রাস্তায় হাঁটলেন , সেই হাটা কখনো “ফানা” কখনো “ কাইটস” বা হালফিলের সলমন অভিনীত ছবি গুলির ছায়া ছেড়ে বেরোতেই পারল না । তবে মসালা বলিউড ফিল্মের সব আছে হিরো দারুন জোরে ছোটে , গাড়ি চালায় , বাইক কসরত করে , এমন কি নায়িকাও পাল্লা দিয়ে এসবের সাথে সাথে হেলিকপ্তার ও চালিয়ে ফেলেন ।ছবিটি দেখতে দেখতে বার বার আপনার মনে পড়বে যে সলমন এক সময় একটি ঠান্ডা পানিয়ের বিজ্ঞাপনে এই রকম ভাবেই আমাদের সামনে আসতেন । ছবির মাঝের ১০ মিনিট এবং শেষের ১৫ মিনিট জুড়ে আন্তর্জাতিক মানের মারামারি বাদ দিলে ছবিটি দেখা বেশ কঠিন ।
এখানেই হতাশ হলাম কবির খান এর কাজ দেখে, “ফরগটেন আর্মি” র মত তথ্য চিত্র যার হাত থেকে বেরিয়েছে , তাঁর থেকে এই ছবিটি দুঃখজনক। যদি কাবুল এক্সপ্রেস বা নিউইয়র্ক এর মত ছবি তৈরির মানুষ নতুন কিছুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা (experiment ) না করেন তবে আগামী কিন্তু ভুগবে।

ছবির যান্ত্রিক দিক দেখতে গেলে দামাস্কাস ,ব্যাংকক , আয়ারল্যান্ড এর মত দেশে সিনেমাতগ্রাফি নিজে ছবির একটা চরিত্র হয়ে ওঠার সুযোগ হারাল যথেচ্ছ ক্রমা ও অপ্রয়োজনীয় হ্যান্ডেল শত এর জারকিং এ, যদিও অ্যাকসন এর ক্ষেত্রে ফলোইং শট আন্তর্জাতিক মানের । কিন্তু এটা একটা ছবির অলঙ্কার হতে পারে , ছবির কথা বলে না ।

অর্থনৈতিক ভাবে এছবি বেশ ভালো বাজেটের ৭০ কোটির এবং ব্যাবসা করেছে প্রথম দিনেই ৩৩ কোটি ফলে বোঝায় যাচ্ছে এ আর একটি বাণিজ্যিক ভাবে সফল অথচ নিন্ম মানের ছবি কে আমরা দেখলাম সুধুমাত্র স্টার এফেক্ট দিয়ে পার হয়ে যেতে। শেষে যে আশা নিয়ে আমারা অপেক্ষা করতে পারি যে কবির খান এই কাচা দরের ছবি থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসবেন এবং আমাদের আবার সময় এর কথা বলে এমন ছবি বানাবেন।



ডিরেক্টরঃ কবির খান । প্রোডিউসারঃ আদিত্য চোপড়া । অভিন্যঃ সলমন খান , ক্যাটরিনা কাইয়ফ , রনবির সুরি সিনেমাটগ্রাফিঃ অসীম মিশ্র । মিউজিকঃ সোহেল সেন , সাজিদ- ওয়াজিদ।

বৃহস্পতিবার, ৯ আগস্ট, ২০১২

মেঘ সরিয়ে বৃষ্টি আসে......তারায় ঢাকা বেড়ার ঘরে।।


ঋত্বিক কুমার ঘটক, একটা প্রতিস্টান, একটা বিষয়।  গোটা জীবন দিয়েও হয়ত তাকে বোঝা অসম্ভব যেমন অসম্ভব তাঁর গোটা একটা ছবি কে নিয়ে লেখা তাই ও পথে আমি আর গেলাম না আমি তাঁর ছবির ছোটো

একটা দৃশ্যের কথা বলি "মেঘে  ঢাকা তারা" ঋত্বিক বাবুর চতুর্থ ছবি যে ছবিটা হয়ত প্রত্যক্ষ ভাবে বা পরোক্ষ ভাবে প্রত্যেক বাঙালীর কথাই বলে ছবিতে রবি ঠাকুরের ব্যবহৃত গান "যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে"  এর দৃশ্যায়নে যে গুঢ় অর্থ লুকিয়ে আছে তার আলোচনাই এ লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য
 ছবির মূল ভাবধারায় না গিয়ে যদি মাত্র শুধু দেবব্রত বিশ্বাস ও গীতা ঘটকের কণ্ঠে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের সঙ্গীত পরিচালনায়   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  গানটির দৃশ্যায়নে যাওয়া যায় তাহলে আমরা প্রথমত সমগ্র গানটির দৃশ্যে দুটি চরিত্রকে দেখতে পাই চরিত্রগুলির নামাকরনে যদি যাওয়া যায় তাহলে একজন ছবির প্রধান প্রতিনিধি "নীতা" আরেকজন তাঁর দাদা "শঙ্কর" অভিনয়ে সুপ্রিয়া দেবী ও অনিল   
গানটির শুরুই হয় নীতার সংলাপ দিয়ে " দাদা আমায় গান শেখাবি.........বাসর ঘরে গান গাইতে হবে যে" সংলাপ শেষের সাথে সাথেই গান শুরু হয়
প্রথম শট    ক্লোস আপ শঙ্কর ওরফে নীতার দাদার ক্যামেরা স্থির এক জায়গায় গান শুরু হয় "যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে" প্রথমে শঙ্কর মাথা নীচু করে চোখ বন্ধ করে গান শুরু করে তারপর মুখ ফিরিয়ে নেয় এখানেই এই দৃশ্যের শেষ হয়
               এই দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই শঙ্করের ক্লোস আপ শট্ নীতার দৃষ্টিকোণ (পয়েন্ট অফ ভিউ)  থেকে আমরা বুঝতে পারি না তারা কোথায় আছে, তাঁদের অবস্থান কি খুব অন্ধকার ঘরের অবস্থা, প্রায় কিছুই দেখা যায় না শঙ্করের মুখ একদম পর্দার ডানদিকে, তাঁর চাহনি বাঁদিকে একমাত্র তাঁর মুখের ওপর হাল্কা আলো, আর তাঁর পিছন থেকে হাল্কা আলোর একটা রশ্মি আসছে যাতে মাথার চুলের অংশবিশেষ উজ্জ্বলিত
দ্বিতীয় শট      মিড ক্লোস আপ শঙ্করের ক্যামেরার স্থান বদল হয়েছে পর্দায় শঙ্করের অবস্থানও পরিবর্তন হয়েছে ডানদিক এর পরিবর্তে এখন সে  বাঁদিকে এক্ষেত্রেও ঘরে তাঁর অবস্থান বোঝা যায় না
শঙ্করের মুখের কিয়দংশ হাল্কা আলোয় উজ্জ্বলিত তাঁর সামনে একটা হ্যারিকেন এবার বোঝা যায় তাঁর পিছনে বেড়া আছে বেড়ার ছোটো ছোটো ফাকা দিয়ে হাল্কা আলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাতে কিছুই পরিবর্তন হয়নি শুধু আলোর অনুপ্রবেশ বেড়ার অস্তিত্বকে প্রমান করেছে
এরপর শঙ্কর এর ঘাড় ঘোরানোর সাথে সাথে ক্যামেরারও পর্দার ডান দিক থেকে বাঁদিকে পার্শ্বপরিবর্তন হয় পার্শ্বপরিবর্তন এর মাধ্যেমে নীতা ও শঙ্কর একই ফ্রেমে আসে, এরপর নীতার মিড ক্লোস আপ এ এসে ক্যামেরা স্থির হয় নীতার মুখের কিয়দংশ মনে হচ্ছে দূর থেকে আসা হাল্কা আলোয় উজ্জ্বলিত তাঁর ঘাড় ঘোরানোর সাথে সাথে তাঁর মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় এবং ঘাড়ের অংশটি সেই আলোয় উজ্জ্বলিত হয় পুরো ঘর জুড়ে অন্ধকার শুধু নীতার ঘাড়ের ওপর আলো আর তাঁর ডানদিকের বেড়া দিয়ে আলো ঢুকে তার অস্তিত্ব প্রমান করছে  
এই অংশে নীতার ঘাড়ের ওপরই আলো ফেলা বাকিটা অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে পরিচালক কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন সাধারনত আমাদের মত ছাপোষা বাঙালীদের সারা জীবনেও ঋত্বিক কুমার ঘটককে জানা সম্ভব নয় তাই আমরা নিজেদের আভিজাত্য ফলানোর দায় সর্বসমক্ষে বলে দিই “ও আবার কী জন্য এমনিই করেছেন বেশী টাকা ছিল না তাই অমন অন্ধকারই রেখেছেন, আলোর ব্যবস্থা করতে পারেন নি হয়ত" ওহে আমার অতি মূর্খ বন্ধু ছবি দেখা আর ছবি পড়া দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিস্তর বিদেশী ছবি দেখলেই আর বিদেশী তারকার নাম জানলেই যদি ছবি বোদ্ধা হওয়া যেত তাহলে সারা কলকাতায় এর সংখ্যা অনেক হত  তাই যারা কিছু হবে না কিছু ছিল না বলে দাবি করে তাদের কাছে অনুরোধ দয়া করে এ কথা বলবেন না, আগে বাংলা ইতিহাস জানুন আগে বাংলা ছবি বুঝুন তারপর অতি বড় চালাকের মতন মন্তব্য করবেন আগে ছবির ভাষা বুঝুন মন্তব্য না হয় নাই করলেন
ছবির শুরুর দৃশ্য ও শেষের দৃশ্য এর তুলনা করা যায় তাহলে আমরা দেখতে পারি যে নীতার আগমন কোথা থেকে আর প্রস্থান বা বিসর্জন কোথায় হয় তা আমরা জানি না  নীতাকে তাই এখানে এক ঐশ্বরিক রূপের সাথে তুলনা করা হয়েছে আর আমাদের বাঙালীদের কাছে নারী রুপী ঈশ্বর বলতে দেবী দুর্গার কথাই আগে ভেসে আসে পরিচালকের কল্পনারুপী দেবী দুর্গা হল নীতা
এ সত্য প্রমান করার জন্যেই পরিচালক এ দৃশ্যে নীতার গলার ওপরই শুধু আলো ফেলে তাঁর গলার ওপর আলো ফেলার যে যৌক্তিকতা তা দেবী মূর্তি কে প্রতিস্থাপিত করে মূর্তি গড়ার সময় মুখ থেকে গলার অংশটুকু ছাঁচে ফেলে করা হয় দেহটুকু আলাদাভাবে গঠন করে ধড়ের ওপর বাকি অংশটুকু বসিয়ে দেওয়া হয়  তুলনামুলক ভাবে তাই সাধারন মানুষের থেকে মূর্তির গলার অংশের দৈর্ঘ্য বেশী হয় তাই নীতার গলার অংশের উজ্জ্বল রাখার পিছনে এ সত্যই প্রকট হয় যে পরিচালক এখানে নীতাকে তুলনা করেছেন দেবীমূর্তির সাথে  
তৃতীয় শট      এটা নতুন করে নেওয়া কোন শট নয় আগের শটেরই দীর্ঘাইকরন ক্যামেরার স্থান পরিবর্তন হয় ক্যামেরা যেখানে ছিল সেখান থেকে দুজনকে একই ফ্রেমে এনে ট্র্যাক ব্যাক করে এবং অনেকটা দূরে এসে স্থির হয় দূরে নীতা ও শঙ্কর বসে আছে তাদের ওপর হাল্কা আলো শুধু তাদের অস্তিত্ব প্রমান করছে ক্যামেরার ফোকাস তাদের ঘরের ছাদের ওপর সিলিং এ হাল্কা আলো প্রতিফলন করে ফেলা হয়েছে আমাদের কাছে এইবার তাদের ঘরের অবস্থাটা পরিস্কার হয় এতক্ষণ বাদে আমরা বুঝতে পারি তাদের শারীরিক অবস্থানটা কোথায়
ক্যামেরা কিছুক্ষন স্থির থাকার পরেই আবার ট্র্যাক ইন করে একই ফ্রেমে দুজনকে রেখে স্থির হয়, দুজনের মিড ক্লোজআপ শটে
চতুর্থ শট    এই দৃশ্যটাই অনেকের কাছে বোধগম্য নয় কেন এই দৃশ্যে নীতার এক্সট্রিম ক্লোজআপ শট নেওয়া হল এবং নীতা ছাদের দিকে তাকিয়ে গান গাইতে লাগল
পরিচালকের কৃতিত্ব সেখানেই যেখানে একটা ছবি পরিচালকের কল্পনাপ্রসূত হয়ে তা সক্ষম রূপ নেয় এবং তা স্বয়ং পরিচালকের ছবি হয়ে দাড়ায়
 মেঘে ঢাকা তারায় এই দৃশ্য কোথায় পরিচালক বুঝিয়ে দেননি,এখানে তিনি তাঁর কল্পনাকে বাস্তবায়িত করেছেন ছবিটা শুরু থেকে দেখলেই বোঝা যায় এই অংশে এসে নীতার বিসর্জন ধীরে ধীরে আসতে চলেছে তাই বিসর্জনের সমতুল্য কিছু দৃশ্যায়িত করার জন্যেই এই দৃশ্য
নীতার ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা প্রতিমা বিসর্জনের সময় যখন নদীবক্ষে প্রতিমাকে ফেলা হয় সেই সময় শুধুমাত্র তার মুখমণ্ডলীটাই জলের ওপরে ভেসে থাকে বাকীটা ডুবে যায়, এই দৃশ্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে
দেবী প্রতিমা যেমন কিছুদিনের জন্যেই আমাদের কাছে আসেন তেমনি নীতার জার্নিটাও কিছুটা সময়ের ছবিতে পরিস্কার হয় না নীতার এর আগে কি ছিল, নীতারে এর পর কী হবে আমরা জানতে পারি না নীতার শেষে কী হয় দেবী প্রতিমার মতই নীতার আগমন ও বিসর্জনের কথা আমাদের কাছে রহস্যাবৃত থেকে যায়
পঞ্চম শট  শঙ্করের মিডক্লোজ আপ, তাঁর মুখের ওপর হাল্কা আলো, পর্দার বাঁদিকে তাঁর চাহনি শঙ্কর গান থামায় কিন্তু নীতা তখনও গান গেয়ে চলে, শঙ্কর তাঁর মুখের দিকে তাকায়, এইখানেই এই শট শেষ হয়
ষষ্ট শট   নীতা এই দৃশ্যেও আগের মত ওপরের দিকে চেয়ে থাকে এবং তাঁর পিছনে ঝাপসা দুটো আলোর উৎস উজ্জ্বলিত হয়ে থাকে
এই দৃশ্যেও আরও পরিস্কার ভাবে নীতাকে দেবীরূপে দৃশ্যায়িত করা হয়েছে তাঁর পিছনে দুটো উজ্জ্বল আলোর উৎস দিয়ে দেবীর পিছনে যেমন একটা আলোর উৎস তাঁর দৈবিক রূপকে প্রকাশিত করে থাকে তেমনি এখানেও নীতার পিছনে একটা আলোর উৎস তাঁর সাথে দেবীর তুলনাকে আরও দৃঢ় ভাবে প্রকাশিত করে
এখানেই এই গানটির শেষ হয় গানের শেষ দুই লাইনের সাথে সাথে চাবুকের শব্দ ও ভেসে আসে ঋত্বিক বাবুর ছবিতে এই শব্দ এর প্রয়োগ যে কতটা গুঢ় অর্থবহন করে তাঁর আলোচনা অন্য আরেকদিন করব আজ এইটুকুই থাক
পরিশেষে ধন্যবাদ সেই সমস্ত মানুষদের যাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ছাড়া এই লেখা অসম্ভব ছিল
ধন্যবাদ।। 

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই, ২০১২


অপুর দর্শন



অপারিজিত ১৯৫৭ তে সত্যজিৎ রায় এর ছবি। আমার অনুভুতিতে ভারতের চিরকালের আধুনিক ছবির শেষ কথা । 
বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালি থেকে পরিচালক কিছু অংশ নিয়ে নিজের মত করে ভারতীয় সমাজ কে তুলে ধরেন পৃথিবীর সামনে। পথের পাঁচালি , অপারাজিত , অপুর সংসার । অপু নামের এক জীবনের চলার কাহিনী ক্রমশ বদলে গেল জীবন দর্শনে।
  

ছবির পটভূমি অনুযায়ী বাংলা ১৩২৭ সন প্রায় ৯০ বছর আগের এক গ্রামীণ বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারের বালক এর আধুনিক জীবন খোঁজের সফর । এ আধুনিকতা কেবল শরীর বা পারিপার্শ্বিকতার নয়, এতো অন্য চলা যেখানে সব কিছু ছাড়িয়ে উঠে আসে মানুষ । তাই কাশী থেকে ফিরে আসতে হয় পিতাহীন অপুকে অন্তত পূজা করে সংসার চালাতে পারবে এই আশায়। বাংলার মাটিতে সর্ব প্রথম সে দেখতে পারে সেই রেলগাড়ি , আধুনিক পৃথিবীর গতিময় জীবনের নিদর্শন। সকালে পূজা চলতে থাকে কিন্তু সে মাকে জানায় “ মা আমি স্কুলে পড়ব ?” শুরু হয় বিজ্ঞান ভিত্তিক চলা, ক্রমশ পরিচিত হতে থাকি আমরা বাইরের বিশ্বের সাথে ।



এই আধুনিকতা বাস্তবিক হয়ে ওঠে ছাত্র অপুর মেধা আর জ্ঞান এ। এস্কিমো , থেকে আফ্রিকা , গ্যালিলিও থেকে পাস্কেল এ জানা তো বস্তুত বিশ্বের খবর জানা । অজ পাড়াগাঁয়ের বালক অপু যখন হ্যারিকেনের আলোতে সূর্য গ্রহণ কি? এর উত্তর পরীক্ষার মাধ্যমে বর্ণনা করে তখন ভারতীয় সমাজের কুসংস্কারের শাপমুক্তি ঘটে এ ছবিতে। স্কুল ফাইনাল এর পর কলকাতা যাওয়ার প্রস্তাব মুখমুখি দাড় করায় সম্পর্ক আর উন্নত জীবন কে। গ্লোবে কলকাতা খোঁজা তো নাম এর বাইরে ভূগোল কে খুজে দূরত্ব মেপে নেওয়া । মা কে ছেড়ে সেই রেলগাড়ি তে কলকাতা তো আবেগ এর মধ্যে থেকেও বার বার বধ্য জীবনকে প্রশ্ন করে আর কত রাস্তা গেলে মানুষ নিজের কাজ বুঝতে পারবে । প্রথম চিঠি তে তার ঘরে যে বৈদ্যুতিক বাতি আছে মাকে জানায়।




এই আধুনিক চিন্তা, মনন , দৃষ্টি এর আগে আর কোনও ভারতীয় ছবি তে দেখা জায়নি । জন রেনয়া বলে গেছিলেন “ তোমাদের ছবির নিজস্ব ভাষা যদি খুজে না নিতে পার তবে সেই ছবি কোনদিন চিরকালীন হবে না ” এর আগে ছিন্নমূল বা তারও আগে বিদ্যাপতী তে আভাস পাওয়া গেলেও পথের পাঁচালি থেকে অপারাজিত তে প্রতিষ্ঠা পায়।



আধুনিকতা মানে নিজস্বতাকে বিসর্জন নয় ,


“কোন ভাষা মরমে পুষি আকূল কোরে তোলে প্রাণ,
কোথায় গেলে শুনতে পাবো বাঊল সুরে মধুর গান ” 

ছাত্র অপুর পাঠে খুশি হেড স্যার, সেই কারনেই ছবিতে অপু শহর থেকে ফিরে পুকুরে স্নান করে , সূর্য ঘড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়াতে পঞ্জিকা তে সূর্যউদয় এর সময় দেখে, ইচ্ছা করে ট্রেন ছেড়ে মা‘র কাছে ফিরে আসে।


তবে কোনও কিছু কে অর্জন করতে গেলে নিজস্বতা কে কিছুটা হলেও বিসর্জন দিতে হয় , ছবি তে অপুর সাথে ক্রমশ মা এর সম্পর্ক শীতল হয় , মানসিক দূরত্বের হিসাব “ ও কিছু টাকা মানিঅর্ডারে পাঠিয়ে দিয়েছি” মেলে না। পরিচালক পারতেন খুব সহজ ভাবে মা ও ছেলের মিল করিয়ে দিতে কিন্তু সেখানে আর এই বাস্তব টা থাকত না। এটাই শিক্ষা , দর্শন যা এ ছবি কে চিরকালীন করেছে। শেষ দৃশ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির বেতের পাত্র যা অপুর মা ব্যাবহার করতেন এবং অপুর আধুনিক পৃথিবীর গ্লোব কে একই সাথে বেধে মা , বাবা হীন কিশোর এর কলকাতা যাত্রা তো আধুনিকতা আর নিজস্ব সংস্কৃতিরএকসাথে পথ চলার শুরু। এবং এ সফরে কোথাও বধ্যতা নেই , কূসংস্কর নেই ।


আবহ সঙ্গীত , ক্যামেরা , লাইট বা অভিনয় নিয়ে বলার ধৃষ্টটা আমার নেই। এ যে জীবনদর্শন।