শনিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৩




প্রথম বার কোনও শিশু শ্রমিক তৃতীয় লাইন থেকে গেয়ে ওঠে

 “ সারে জাহাসে আচ্ছা”




                  ফেলে দেওয়া, ভাঙাচোরার ডাস্টবিনের জিনিষ বাছাই করা ছেলে , কাকুর কাছে থাকে নাম ‘গাট্টু’ । জানতে পারি সে অনাথ , বাবা মা নেই ঘিনেঘিনে নোংরা গলিতে তার বসবাস কাকার সাথে। আর কাকা বাদে আর একটি প্রাণী তার কাছের “ টাইগার” , গাট্টুর প্রিয় ভেড়া। যার দিন শুরু হয় গাড়ির একটা ভাঙাচোরা সীট থেকে ,সে বিছানা হিসাবে ব্যবহার করে, কাকুকে খাবার তৈরি করে সে কাবারি/দি বাছাই এর কাজে লেগে পড়ে। কিন্তু আকাশে ঘুড়ি দেখলেই তার মন উত্তাল হয়। আর কাজের ঠিক থাকে না সে বেরিয়ে পড়ে। সে অন্যদের সাথে খুব একটা মেসে না। ঘুড়ি ধরার থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর দিকে তার ঝোঁক অনেক বেশী। সে সরাসরি লড়াইতে আসতে চায় আকাশের উচুতে ওরা ঘুড়ি গুলির সাথে। এখানেই আমরা পরিচিত হয় “ কালী” নামের এক শক্তিশালী ঘুড়ির সাথে। পরিচালক প্রথম পাঁচ মিনিটেই হানা দেন আমাদের সব থেকে প্রিয় শৈশবে। আমরা একাত্ম হয়ে পড়ি ছবির সাথে।



গাট্টু ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে , টাকা চুরি করে । নীল আকাশ তার কাছে নেশার মত। বার বার সে ঐ “কালী” ঘুড়ির সাথে অসম লড়াই তে হেরে যেতে থাকে । আর প্রতিবার তার চোয়াল সক্ত হয় জেদ বেড়ে যায় নতুন প্রস্তুতি নিয়ে আবার ঘুড়ি যুদ্ধে আসতে চায়। এই পর্বে আমাদের ভাষাতে গাট্টুর “ স্ট্রিট স্মার্টনেস” ফুটে ওঠে দারুন ভাবে । সে পাড়ার দোকানদার এর মেয়েকে ডিভিডি এনে দেওয়া হোক বা পাড়ার দর্জিরকে পোটিয়ে ছাদ পাওয়া হোক। এসবের মাঝেও কোথাও একটা নিজস্ব স্নেহ বোধ কাজ করে যে কারনে সে তার পোষা ভেড়া যাকে টাইগার নামে ডাকে তাকে নিয়মিত দুধ খাওয়াতে ভোলে না। আমরা ধীরে ধীরে গাট্টুর সাথে এক হয়ে যেতে থাকি যে কারনে টাকা চুরি করার মত কাজেও হাত তালি দিয়ে ফেলি। আমাদের মননও গাট্টুর ওড়ানো ঘুড়ির সাথে উড়তে থাকে আকাশে। ফলে দু একটা দৃশ্যে অতিপাকামিকে আশকারা দিয়ে ফেলি। কিন্তু পর্বের চেষ্টাও ব্যার্থ হয়।



পরিচালক রাজন খোসা এখানেই আসল কাজটা করেন নিছক একটা ঘুড়ি কেন্দ্রিক গল্পকে অন্য উচ্চতাতে নিয়ে ফেলেন । বিসন্ন গাট্টু জানতে পারে তার এলাকার স্কুলের ছাদ সব থেকে উচু যদি শেখান থেকে ঘুড়ি ওড়ানো সম্ভব হয় তবে “কালি”কে কাটা সম্ভব। কোনোদিন স্কুলে না পড়া গাট্টু এক অদ্ভুত চতুরতাতে ভর করে ভর্তি না হয়ে স্কুলে ঢুকে পড়ে। সে নতুন জগতের খোজ পায়। প্রথম বার কোনও শিশু শ্রমিক তৃতীয় লাইন থেকে গেয়ে ওঠে “ সারে জাহাসে আচ্ছা”। সে প্রথমবার জানতে পারে জন্মদিন নামে একটা ব্যাপার আছে। ঘরে ফিরে কাকাকে প্রশ্ন করে “ কাকা আমার জন্মদিন কবে?” কাকা উত্তর দিতে পারেন না । শুধু বলেন তোকে তোর বাবার থেকে কিনেছিলাম। এখন ঘুমিয়ে পর আর এসব পাগলামি ছেড়ে মন দিয়ে কাজ সেখ । সিনেমা হল নিঃশব্দ হয়ে যায় হটাৎ। একজন গাট্টু নয় , লক্ষ গাট্টুর কথা এভাবে প্রকাশ হয়।



ছবিটি মহান বানী দানের ছবি হয়ে ওঠার তৃতীয় এবং সবথেকে জোরালো সম্ভবনা কে বাদ দিয়ে এখান থেকে পরিচালক আবার ঘুড়ির গল্পে ফেরত আসেন । আমি আপ্লুত হয়ে পাসে বসা ফিল্ম স্টাডিস পড়া আদিত্যর দিকে চোখ ইশারা করে জানিয়ে দি । এই পরিচালক আমার প্রিয়তম পরিচালক দের তালিকাতে ঢুকে পরলেন। গাট্টু বুঝতে পারে ক্লাস করতে হলে বই নামক বস্তুর প্রয়োজন হয়, সে সেটাও চুরি করে অন্যের ব্যাগ থেকে এবং ধরাও পড়ে সহপাঠীদের হাতে । শেখান থেকে আবার অন্যভাবে বন্ধুত্বের শুরু হয় এ বারের মত গাট্টু সাস্তির হাত থেকে বেচে যায়। যারা সালাম ডগ মিলিয়নিয়ার “ স্টোরি টেলিং” পছন্দ করেছিলেন তাদের কিন্তু এছবিও ভালো লাগবে। গাট্টু শেষ পর্যন্ত স্কুলের ছাদে যেতে সফল হয় এবং একই সাথে কাকার কাছে ধরা পড়ে যায় যে সে দীর্ঘদিন কাজ না করে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। প্রবল বকুনি জোটে। হায়-রে সর্ব শিক্ষা , হায়-রে শিক্ষার অধিকার।



গাট্টুর জীবন কঠিন হয়ে ওঠে একদিকে নিজের ঘুড়ি ওড়ানোর যুদ্ধ, একদিকে কাকার বকুনি, একদিকে বন্ধুত্ব একদিকে ভালো লেগে যাওয়া স্কুল একসাথে ঘুড়ির প্যাঁচে আটকে ফেলে ছোট্টো ছেলেটাকে। যেমন আমরা আটকে পড়ি প্রতিমুহূর্তে জীবনের “কালি”র সুতোর প্যাঁচে।   গাট্টু কি পারল সফল হতে? এটুকু যারা দেখেননি তাদের জন্য তোলা থাক। তোলা থাক রাজন খোসার মুন্সিয়ানা। 



বরং কথা বলা যেতে পারে ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্যের গ্রাফিক্স নিয়ে। কথা হোক একটা ছোট্ট গল্পের মধ্যেকার এই “সময়” এর “ডকুমেন্টেশন” নিয়ে। কথা হোক শিশু শিল্পী মহম্মদ সামাদ(গাট্টু) এর পুরো ছবি জুড়ে পা টেনে টেনে হাটার অভিনয় নিয়ে। নরেশ কুমার হিসাবে গাট্টুর কাকাকে নিয়ে। তবুও এছবির অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়ে আমার কাছে কোনও খবর নেই।



তবে অন্য এক “দেখা” দেখলাম আমি, তা কিছুটা এরকম

     ২০ এপ্রিল ২০১২, শুক্রবার , খুব কম প্রচার করেই রিলিজ হয়েছিলো গাট্টু একটু ব্যাস্ততা ছিল তাই ভেবেছিলাম ৩/৪ দিন পরে দেখব ছবিটা। কিন্তু আমার সময়ে যখন আমি পৌছলাম দেখলাম শো টাইম পরিবর্তন হতে হতে দিন পিছু মাত্র একটা শো হচ্ছে। চিলড্রেন ফিল্ম তো নাকি মার্কেট নেই।




     ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, শুক্রবার , নন্দন চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্ট সেই সন্ধ্যা ৬ টায় শো কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটে থেকেই ভীষণ লম্বা লাইন পড়েছে। সবাই গাট্টু দেখতে এসেছেন। কতশত আলোচনা উঠে এলো শেখান থেকে কেউ বলছেন বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানীর ছোটবেলার গল্প তো কেউ বলছেন কোনও এক মুম্বাই খ্যাত ডাক্তার এর ছোটো বেলার গল্প। তখনও ঊশষী আসেনি ফলে আমি আর আদিত্য এসব উদ্ভট গল্প শুনছিলাম । সবটাই বাচ্চাদের মা- বাবা দের তৈরি আসলে বুঝলাম এটা সেই সংক্রামক মানসিকতা যারা তাদের বাচাকে একদিন সময় করে একাডেমিক এর বাইরে নিয়ে সেদিন এর গাট্টু দেখাতে নিয়ে যান নি। সেটা হলে নিছক ঘুড়ি ওড়ানো একজন শিশু শ্রমিক এর কথা গল্পে কিছুতেই ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার এর কথা আসতো না।  মনটা খুব আবেগপ্রবন হয়ে ওঠে পকেট থেকে সেল ফোন বের করে গাট্টুর পরিচালক রাজন খোসা কে মেসেজ করি এই ভিড় এর কথা জানিয়ে। এতো মানুষ একসাথে কোলকাতাতে ওনার ছবি দেখতে ভিড় করেছে জেনে উনি খুশি হয়ে শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়ে মেসেজ করেন। রাতে কথা হবে এই মর্মে।



প্রযোজক- চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া
পরিচালক – রাজন খোশা
চিত্রগ্রহণ- সত্য রাই নাগপাল
অভিনয়- মহম্মদ সামাদ , নরেশকুমার







সোমবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৩


দাবাং-২



হেয়ার স্কুল এর সামনের ফুট পথে যে ঘুঘনি পাওয়া আমরা নাক মুছতে মুছতে জিভে শব্দ করে খাই বা বিবেকানন্দ পার্কের ফুচকাতে কোনও বিশেষ খাদ্যগুণ আছে এমনটা কিন্তু আমার জানা নেই। তবুও শুধু স্বাদ এর আকর্ষণে পেট খারাপের ঝুকি নিয়েও বিকেল হলেই মন ছুটে যাই সেদিকে। স্বাদ এর কথা যখন এলো তখন বলি এবছরের বাণিজ্যিক হিন্দি ছবির সেরা রাধুনি সলমান খান এর সেরা ডিশ কিন্তু “ দাবাং-২” । স্বাদে , গন্ধে, রূপে এক দারুন সংমিশ্রণ অকারনে সিনেমাটিক ভিউ খুজতে গিয়ে ফিল্ম স্টাডিজ এর ছাত্রদের মত খুত না ধরেলে কিন্তু এক উপভোগ্য ছবি। খুব সাধারন একটা  গল্প কিভাবে মশলা দিয়ে সুস্বাদু করতে হয় তার নিদর্শন।


চুলবুল পাণ্ডে এখন বদলি হয়ে কানপুর এসেছেন, পরিবার নিয়ে , মানে বাবা, ভাই, স্ত্রী সবাই কে নিয়ে। এখানেই তিনি ঠিক করে দেন দাবাং যদি ঘর ভাঙার কথা হয়, তবে দাবাং-২ সবাইকে নিয়ে ঘর বাধার গল্প। বাবা প্রজাপতি বা ভাই মাখন বা স্ত্রী সকলের মধ্যে সেই একসাথে থাকার সুখি ছবি স্পষ্ট। ফলে আগের ছবির বাবা ছেলে বা ভাই-ভাই লড়াই এখানে নেই, তাহলে দাবাং-২ মারামারি নেই? আল্ বাত আছে এখানে ছেদি শিং নেই তাতে কি হয়েছে বাচ্চা ভাইয়া তো আছেন তবে তার সাথে পুলিশ চুলবুলের লড়াই কিন্তু সারা ছবি জুড়ে নয়। কানপুরে বরং তিনি অনেক ছোটো ছোটো দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করেন তা মেয়ের বিয়েতে বাধা দেওয়া গুন্ডা কে মেরে হোক বা বয়স্ক মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করা পুলিশ কনেস্টেবল কে “ বাবার সাথে এই ভাবে কথা বল নাকি?” এই ভাবে ধমকে হোক। ফলে সারা ছবি জুড়ে এক বন্ধুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা দেওয়া পুলিশ কে দেখি। দাবাং এর তুলনাতে মারামারি অনেক কম করেছেন ঠিক কিন্তু যে টুকু করেছেন তা কিন্তু টেকনিক্যালি ভয়ানক শক্তিশালী যেমন এক ঘুষিতে গুণ্ডাদের ক্যামম্বিস বলের মত বাউন্স করিয়ে দিতে পারেন বা এক লাথিতে রোলারের মত গড়িয়ে দিতে পারেন ।




এই চুলবুল ঘরে ফিরলে অন্যরকম স্ত্রীর সাথে খুনসুটি করেন , যা দেখে বিবাহিতা নারীদের ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া স্বামীদের ওপর যথেষ্ট রাগ হতেই পারে। আবার বাবার সাথে ছাদে পাশাপাশি শুয়ে ফেলে আসা অতীতের গল্প শোনার জন্য বায়না করতে পারেন। মৃত মা এর ছবির সামনে দাড়িয়ে ছবির সাথে কথা বলতে পারেন। আবার ভাই মাখন এর অল্পবুদ্ধি নিয়ে মজা করতে পারেন। কিন্তু  জামা খোলা সলমান এতো সংসারি হয়ে গেলে “ঝান্ডুবাম খ্যাত” মুন্নিদের কি হবে ? অবশ্যই কিছু হবে আর হবে বলেই তিনি করিনার সরু কোমর এর জাদু দিয়ে “ফেভিকল” আটকেছেন, আমাদের জন্য নিজে আইটেম নেচেছেন। গরম মালাইকা কে পর্দাতে এনেছেন দারুন ভাবে।


ছবির সেরা অংশ সন্তানসম্ভবা স্ত্রী কে নিয়ে আর বড় পরিবার গড়ার প্রস্তুতি চলাকালীন বাচ্চা ভাইয়ার অত্যাচারে  সন্তান- ভ্রুন নষ্ট হয়ে গেলে প্রতিশোধকামী স্বামী হিসাবে পুলিশ চুলবুল এবং সন্তান হারার যন্ত্রণা ক্লিষ্ট নারী হিসাবে তার স্ত্রীর বাকরুদ্ধ মুহূর্তে প্রতিশোধ এর প্রতিজ্ঞার জন্ম দেওয়া দৃশ্য, ছবির ক্লাইমাক্স এর জন্ম দেয়। এরপর আমরা বহু প্রতীক্ষিত নায়ক কে দেখি।


কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে কেন সারা ছবি জুড়ে এতো মুখমুখি লড়ায় এর সম্ভবনা থাকা সত্তেও , বাচ্চা ভাইয়া আর চুলবুল কে মাত্র একবার সামনাসামনি লড়তে দেখি ছবির শেষে আসলে। এখানে আমার ব্যাক্তিগত একটা মনে হওয়া আছে বাচ্চা ভাইয়ার চরিত্রে অভিনয় করা প্রকাশ রাজ এর আগের হিট ছবি “সিঙ্ঘম” এর সাথে এই ছবির চরিত্রটা এক হয়ে যাক এটা বোধ হয় চান নি পরিচালক বা সলমান নিজে।


ফলে এক নতুন সম্ভবনা তৈরি হয় ছবির শেষে গিয়ে , যেখান থেকে খুব সম্ভবত দাবাং-৩ হবে। কি সেই সম্ভবনা তা বললে তো সব বলা হয়ে গেল বরং নিজে এই ছবি দেখুন বুঝতে পারবেন নিজেই।


দাবাং এর পরিচালক ছিলেন অনুভব কাশ্যপ এখানে তিনি অনুপস্থিত তার জায়গা সামলেছেন আরবাজখান। ফলে কিছু ফাঁকফোকর থাকা টা স্বাভাবিক এবং ছিলও কিন্তু ব্র্যান্ড চুলবুল তার নিজের সাত রঙের ঝলকানিতে তা ঢাকার চেষ্টা করেছেন খুব করে। সে মারামারির দৃশ্যে ক্রেন এর ওপরের ক্যামেরাকে হাতের ইসারাতে নিচে ডেকে হোক বা উত্তরপ্রদেশ , বিহারের এর দর্শক দের কথা মাথায় রেখে একাধিক আইটেম নম্বর রেখে হোক, বা মাহিগিল এর মত সুন্দরী কে খুব ছোট্ট অংশে পর্দাতে এনে হোক বা সাজিদ- ওয়াজিদ এর মিউজিক দিয়ে হোক , বা প্রকাশ রাজ এর হাড়হিম করা চাহনি দিয়ে হোক। আসল কথা সলমান হলেন সেই পাক্কা রাধুনি যিনি সুস্বাদু বিরিয়ানি রান্না করতে এবং খুব তাড়াতাড়ি বেচতে পারেন। যে কারনে প্রথম চারদিনে ছবির বিক্রি ১০০ কোটি পেরিয়ে যেতে পারে নিশ্চিন্তে।  তবে ফিল্মবোদ্ধা দের আশঙ্কা “ যে পরিমান অ্যাকসান–কমেডি গোছের ছবি হচ্ছে তাতে দর্শক খুব তাড়াতাড়ি স্বাদ বদল করার জন্য অন্য কিছু খুজে নেবে না তো?”  ফ্রেম চলতে থাক বক্স অফিস এর উত্তর নিশ্চয় দেবে।




অভিনয় : সলমন খান, সোনাক্ষি সিংহ, প্রকাশ রাজ,
করিনা কপূর, বিনোদ খন্না, আরবাজ খান, মাহি গিল প্রমুখ পরিচালনা : আরবাজ খান
প্রযোজনা : আরবাজ খান ও মালাইকা অরোরা খান

সঙ্গীত : সাজিদ-ওয়াজিদ
সিনেম্যাটোগ্রাফি : অসীম মিশ্র

বুধবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৩


ফের চলে যাবে করে একলা আমাকে



অগুনতি তারে আটকে ছিলাম , বাইরে পারদ খুব দ্রুত নিচে নামছিলও ,এর মধ্যে আমার ছ’বছরের পুরনো সেল ফোনে একটা এসএমএস এলো“আজ বিকাল তিনটেয় ময়দান , রোদে পিঠ দিয়ে বসবো । আজও যদি দাড় করিয়ে রেখেছিস খুব মার খাবি কিন্তু । প্লিজ ভুলে যাস না যেন আমি আজ কিন্তু রিহার্সাল যাব না' তোর জন্য” আমি তাড়াতাড়ি ছুটি চেয়ে পাড়ি দি ময়দান। দেরি হলে যে আবার আয়ত চোখের শাসন জুটবে খুব করে।  আসলে এ সম্পর্কের যে নাম দেওয়া যায় না বন্ধুত্বের থেকে বেশী আবার প্রেমের থেকে কম।


ফিরতি পথে ভাবছিলাম এমন সম্পর্ক এ শহরের পাজরে প্রতিদিন নতুন রঙ নিয়ে আসে বলেই আজও অসময়ে বৃষ্টি হয়। ভাবছিলাম এমন বিষয় নিয়ে কেন ছবি হয় না। কান , বার্লিন , টরেন্টো তে যারা বাংলা ছবি পাঠান তারা এমন “বোকা–নন ইন্তেলেকচুয়াল” বিষয় নিয়ে ভাবেনা না । আর যারা ওখানকার জন্য ছবি বানান না তাদের ছবি তো আবার টার্গেট অডিয়েন্স এর জন্য হিরো কে প্রচণ্ড মারপিট করতে হবে , ভীষণ নাচতে হবে সে এক ভীষণ জটিল ঘটনা বটে।




এসব ভাবতে ভাবতে আজ দেখে ফেললাম “বোঝে না সে বোঝে না” । এবং দেখলাম অসাধারন এক গল্প বলেছেন রাজ চক্রবর্তী। সম্ভবত তার এখন পর্যন্ত সেরা ছবি । যার প্রতিটা কোনায় কোনায় উকি মারে বাংলা , উকি মারে আপনার প্রথম যৌবন এর অনুভুতি । একটা অ্যাক্সিডেন্ট , অনেক নাম না জানা সম্পর্ক আর ঘরে ফেরার টান দিয়ে বোনা এছবি।  নুর মুর্শিদাবাদ এর ছেলে প্রেমে পড়ে ছটফটে মেয়ে রিয়ার । নুর নিরীহ সুবোধ বালক যে লেদ কারখানাতে কাজ করে আর রিয়া খুব ছটফটে স্মার্ট নার্স । সারা ছবি জুড়ে অদ্ভুত তাদের বিচরন । নুর এর ওপর রিয়া এক এর পর এক প্রেম এর অত্যাচার করতে থাকে বাদ যায় না কিছুই , সে রিয়ার পুলিস অফিসার বাবা হোক বা ছ’বছরের অপছন্দের ছেলেকে দিয়ে মার খাওয়ানো । এখানেই পরিচালক আসল খেলা টা খেলেন নুর এক রক্ত মাংসের মাসে ছ’হাজার টাকা উপার্জন করা লোক সে কিছুতেই সুপার হিরো হয়ে ওঠে না । সে মারামারি করতে পারে না , মদ খেতে পারে না, বান্ধবী কে জড়িয়ে ধরতে পারে না , এমন কি ঠিক ভাবে প্রপোজ ও করতে পারে না তবু সে একটা জিনিষ পারে “ ভালোবাসতে”। আপনার আমার মত মানুষ যে শুধু ভালবেসে যেতে পারে নাই বা থাকল সেখানে শহুরে চালাকি । মালদা পর্বের এই অংশে রাজ যে মালদা কে তার চোখে ধরেছেন টা কিন্তু বাংলা ছবি থেকে বহু বছর আগে হারিয়ে গেছে । অসামান্য সেই পুরনো ইটের শহর এখানে খুব জীবন্ত , কাশ ফুল , আর ধান খেত আর জল ভর্তি ঝিল।
   

বাস দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হওয়া ছবি আসলে আমাদের প্রেমের সফর করাতে থাকে ছবি জুড়ে যেখানে আমরা পরিচিত হই বালুরঘাটের এক মেয়ের সাথে যে প্রথম বার কলকাতায় এসে পথ চিনতে সাহায্য নেয় কোলকাতার এক ছেলের থেকে সে পথ চলা একেবারে কোলকাতার যেখানে জীবন্ত ধর্মতলা থেকে সেক্টর ফাইভ সব খুব প্রতিদিনের মত করেয় ধরা দেয়।  আমরা চিনতে পারি ছবির শেষে গিয়ে মেয়েটি জয়ী আর ছেলেটি অভীক। যে পথ হারানোতে তাদের প্রথম পরিচয় সে পথ তাদের আবার মিলিয়ে দিল এক মৃত্যু আবর্তে। প্রত্যেক চরিত্র আমাদের ভাষা তে কথা বলে বলেই জয়ী বলে উঠতে পারে “গালে কাটা দাগওয়ালা ছেলেটি কোলকাতার হলেও ভালো ছেলে , প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না এখন তো বেশ ভরসা হচ্ছে , কখনো বালুরঘাট এলে আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু” বা রিয়া বলতেই পারে “ তুমি তো আমার চেনা কেউ না তাই রক্ত পরীক্ষা করে দেখে নিলাম তোমার এইডস আছে কিনা”


ছবির শেষ টা বলা উচিত হবে না তবে “বোঝে না সে বোঝে না” গানটি যদি ছবির অনুভূতির প্রমান হয় তবে “ না রে না” কিন্তু পরিচালক এর ম্যাজিক, ক্রমশ সংক্রমিত হচ্ছে এই পিকনিক মরসুমে। আর যান্ত্রিক সুবিধা যে শুধু মাত্র হিরোগিরীতে ব্যবহার এর ভুল ধারনা ভেঙে দিলেন পরিচালক বাস এক্সিডেন্ট এর দৃশ্যে। শেষ তিন বছরে এতো শক্তিশালী এক্সিডেন্ট এর চিত্রগ্রহন বাংলা ছবিতে হয়নি। পুরো ছবি দিনের আলতে সুট হয়েছে তাই ছবি জুড়ে আলো এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে চলে ফ্রেম থেকে ফ্রেমে ।আর ছবি শেষের পর এমনিতেই গুন করে ওঠে

         
“ এটা গল্প হলেও পারত ,
একটা আধটা পড়তাম,
খুব লুকিয়ে বাঁচিয়ে রাখতাম তাকে;
            
জানি আবার আসবে কালকে,
নিয়ে পালকি পালকি ভাবনা,
ফের চলে যাবে করে একলা আমাকে।”


মিলে যেতে থাকে আমাদের অনেক অনেক না বোঝা কথা। বুজতে পারি কেন আদিত্যর প্রোফাইল পিকচারে কেউ লিখে ফেলে “ আবার সেই পচা জামাটা পরেছে” কেন আমদের প্রিয় শিক্ষক তার শতছিন্ন ফোন টা এখনও বাদ দিয়ে স্মার্ট ফোন কেনেন না। বুজতে পারি কেন স্বর্নাঙ্ক গঙ্গার দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে বলতে পারে “ ভালবাসা আসলে অনুভুতি যাকে আতর এর মত অনুভব করতে হয়” কেন চুল বড় রাখা সুভঙ্কর এক আকাশ বৃষ্টি মাথায় উন্মাদ এর মত মেট্রো স্টেশনের দিকে ছুটে গিয়েও না ঢুকে ফিরে ঠায় দাড়িয়ে থাকে। কেন আয়ত চোখের জিনিয়া আমাকে মেরে , খিমচি কেটে , শাসন করে , খিস্তি করার পর ,বলে “আজ তোকে টাকা দিতে হবে না আমি খাওয়াচ্ছি” , কেন গভীর রাতে এসএমএস করে বলে “আজ আবার তুই অন্য মেয়েকে ফিল্ম মুভমেন্ট বুঝিয়েছিস? তোকে নিয়ে আর পারি না মৌন” ছবিটি শেষ হয়েও শেষ হয় না চলতে থাকে এভাবেই।


    
বিদেশে গান বা ছবি বানানোর অষ্টমী চলছে এখন বাংলা ছবিতে। সেখানে রাজ চক্রবর্তী ভীষণ সফল ভাবে ধরেছেন মালাদা শহর কে , তার ঐতিহ্যকে, ইমারতকে আসলে এছবি যে শুধু প্রেমের নয় । এতো হালি শহর থেকে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে কোলকাতাতে পাড়ি দেওয়া এক মানুষের ছাপ , ছবি বানানোর লক্ষে যার দিনের পর দিন একটা মেস বাড়িতে বাকি অভিনেতা বন্ধুদের সাথে ঠেসে থাকা। ফলে সেই মানুষ যখন ছবি বানান তাতে গ্রাম বাংলা থাকবেই, নুর ,রিয়া , জয়ী , অভিক এর মত খুব সাধারন অনুভুতি প্রবন রক্ত মাংসের মানুষ রা জীবন্ত হয়ে উঠবেন। আসলে মফস্বল এর মানুষদের যে বন্ধুত্বের কোনও পর্ব নেই , কোনও জাত নেই , ক্যাবলা বা বুদ্ধিমান এর মত ফারাক নেই আসলে বন্ধুত্বে যে এসব হয়না। ধন্যবাদ রাজ চক্রবর্তী কে এমন ছবির জন্য , এছবি যে আমার মত অনেক ছেলেকে সাহশী করে তোলে যারা ভোরের ট্রেন ধরে ছবি বানানোর স্বপ্ন নিয়ে কোলকাতা আসে আর দিনের শেষে সব হাউস ঘুরে কাজ না পেয়ে গভীর রাতের ট্রেনে খিদে পেটে বাড়ি ফেরে, কাল আবার এই ভাবতে ভাবতে।
     

 পরিচালক- রাজ চক্রবর্তী
প্রযোজনা- শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্ম
অভিনয়ে- সোহম, মিমি চক্রবর্তী, আবীর চট্টোপাধ্যায়, পায়েল সরকার , 
যুধাজিৎ ব্যানার্জি   প্রমুখ

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১২

দিস ইজ নট আ ফিল্মঃ ইয়েস দিস ইজ আ ফিল্ম।


অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছি। খানিকটা সিনেমা নিয়ে পড়ে ও ফেলেছি। যাদবপুরের প্রথম সেমিস্টারটাও দেওয়া হয়ে গেছে। ক্লাসে বসে, কফি কাপ হাতে এর সাথে তার সাথে বারবার তর্ক শুরু করেছি সিনেমা কি সত্যিই সত্যি কথা বলে নাকি কালের যাত্রায় সে দিনদিন তার নিজস্ব ভাষা হারিয়ে বর্তমানে শুধুমাত্র আকর্ষণের কেন্দ্রে এসে উপস্থিত হয়েছে? এ প্রশ্ন আজকের দিনে এসে বড় তাত্ত্বিকেরও করা ভুল হবে। বর্তমান টেকনোলজির যুগে এসে ডিজিটালের রমরমা স্টেজ থেকে ঘোষণা করে “আপনার বাড়ির ছোট ছেলেকেও মোবাইলটা দিন সেও তার মত করে তুলে একটা ছবি বানাক আর আমাদের কাছে এসে জমা দিন আমরা সে ছবি দেখাবার ব্যবস্থা করব”। সুতরাং আজকের দিনে এসে ছবি বানানোটা নিছক একটা ফুলের মালা গাঁথার মত হয়ে গেছে, ওটা যে কেউ পারে। কিন্তু তত্তগত ভাবে তার মূল্য বিচার হয় না, শুধুমাত্র হিসেবের নিরিখে তাকে মাপা হয়। ধুস কি সব হাবিজাবি বলছি কি নিয়ে লিখব ভেবেছি আর কি সব বলে যাচ্ছি। মূল লেখার কথায় আসি।
সেই ক্লাসরুমে কল্লোল বাবুর মুখ থেকে প্রথমবার শুনেছিলাম। ওনার বলার মধ্যেই এমন একটা ভঙ্গিমা ছিল যে ছবিটা দেখার জন্য তখন থেকে মুখিয়ে ছিলাম। কিন্তু সে ছবি তৎক্ষণাৎ তখন পাওয়া যায় নি। বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হল। কিন্তু এই অবসরে তার দু একটি ছবি আরও দেখে ফেললাম। তার দেশের আরও কিছু পরিচালকেরও কিছু ছবি দেখে ফেললাম। কিছুটা হলেও তার দেশ কে চিনলাম। তার দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কথা জানলাম। আমি জাফর পানাহির কথা বলছি। মধ্যপ্রাচ্যের ইরানের পরিচালক জাফর পানাহি। দেখতে শুনতে সুন্দর। ফর্সা। ছোট চুল। গালে দাড়ি নেই। কোন দিক থেকেই তাকে জঙ্গি বলা যাবে না। তবুও তিনি বন্দী। হ্যাঁ গৃহবন্দী। স্বৈরাচারী শাসন তন্ত্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন সরি ক্যামেরা চালিয়েছিলেন। তার আগের ছবি “অফসাইড” এর মুক্তির পর তাকে গৃহবন্দী করে দেওয়া হয়। আর তাকে সিনেমা বানানো থেকে বিরত করে রাখা হয়। হ্যাঁ আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা জানে যে কখন মুখ খুলতে হয়, আর কখন না। বড় বুদ্ধিমান তারা সেই জন্যই না বুদ্ধিজীবী। আসলে তারা জানেন না অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সবসময় হয়ে এসেছে। যখন আমার চারপাশে বর্ম থাকবে তখনই মুখ খুলব আর যখন থাকবে না তখন চুপসে থাকব। আসলে ওই মুখ খোলাটাও যে ক্ষমতার লোভেই। তারা ভাল করে জানেন কখন কেমন রূপ ধরতে হবে। খুব ক্যামেরা কনসাস তারা।
পানাহিও আসলে বুদ্ধিমান। খুব বুদ্ধিমান। তিনিও জানেন কি ভাবে তার মুক্তি মিলবে। আসলে হয়ত এ আমার ভুল। আমারই অত্যাধিক প্রত্যাশা ছিল। যেভাবে ছবির গল্পটা শুনেছিলাম আর যে মানুষটার “মিরর”, “সার্কেল” দেখেছিলাম তার কাছে যে প্রত্যাশাটা অনেক বেশি হবেই। তাকে ছবি না করতে দেওয়ার কষ্টটা যে কি আমিও অতি সামান্য হয়ে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। কিন্তু সারা ছবি জুড়ে তার প্রতিফলন আমি কোথাও দেখতে পেলাম না। কোথাও দেখতে পেলাম উত্তাল ইরানের অবস্থা তাকে কিভাবে বিরক্ত করে। আসলে মিঃ পানাহি এসবের উপরে উঠে গেছেন। এ ছিল তার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। অতি শান্ত নরম গলায় বিন্দুমাত্র ভনিতা না করে হাসিমুখে গোটা একটা ফুল থেকে তার পাপড়ি গুলো ছিড়ে ফেলার মত অহিংস প্রতিবাদ। তাদের কে দেখিয়ে দেওয়া যে শিল্পীকে কখনও বিরত রাখা যায় না সে তার সৃষ্টির পথ ঠিক খুঁজে নেয়। তাই তো মিঃ পানাহিকে বলতে হয় আমরা যদি সিনেমার গল্পটা বলতেই পারি অভিনয় করে দেখাতেই পারি তাহলে সিনেমা বানাব কেন?
সারা ছবি জুড়ে আমরা পানাহিকে দেখলাম। তার কথা শুনলাম। তার আইনজীবীর কথা শুনলাম। জানলাম একমাত্র আন্তর্জাতিক চাপই তাকে মুক্তি দিতে পারে এই বন্দীদশা থেকে। পানাহি বারবার চা খান। মেয়ের আদরের গোসাপকে ইগি বলে ডাকেন। তার সিনেমার দৃশ্য দেখিয়ে আমাদের বোঝান সেই দৃশ্যের সাথে তার অবস্থার মিল কোথায়।  বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন তার ক্যামেরা নিয়ে আসতে কোথাও অসুবিধা হয় নিতো? রাস্তায় পুলিস দেখে কি বলল। বন্ধুকে বলতে শোনা যায় না তেমন কোন অসুবিধা হয় নি ওরা চেক করেই ছেড়ে দিয়েছে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
তিনি নিজের মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করতে থাকেন। ময়লা নিতে আসা আর্ট কলেজের ছেলেটি যখন জানতে পারে যে তিনি ছবি রেকর্ড করছেন সে তখন নিজেকে আরও একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নেয়। পানাহি মোবাইল ছেড়ে বড় ক্যামেরা নিয়ে আসে। লিফটে তার সাথে নামতে থাকে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে কি করবে তুমি এরপর সে বলে কোথাও যাব একটা যেখানে একটু শান্তি পাওয়া যাবে। পানাহি ক্যামেরা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে ছেলেটি বারন করে আপনি বাইরে আসবেন না ওরা দেখে ফেলবে। আমরা দেখতে পাই প্রথমবার তার ঘরের বাইরের দৃশ্য আগুন জ্বলছে বাইরে। পুড়ছে মানুষ পুড়ছে সমাজ পুড়ছে দেশ। ছবি শেষ। আমার বারবার মনে পড়ছে দুটি লাইন
“কাছে থাকো। ভয় করছে। মনে হচ্ছে।
এ মুহুর্ত বুঝি সত্য নয়। ছুঁয়ে থাক।”
নিঃশব্দে কিভাবে ছবি বানানো যায় সে ছবিও আলমারির পিছনে লুকিয়ে থাকা প্লেবয় ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা ছিড়ে কিভাবে মানবতার সামনে এসে দাড়ায়। প্রশ্ন করে আর কতক্ষন লুকিয়ে থাকবে। এবার যে বেরিয়ে এস নিজের হাতে তুলে নাও অস্ত্র রুখে দারাও সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এভাবেও ছবি বানানো যায়। এভাবেও নিজের কথা মানুষকে জানানো যায়। এভাবেও মুক্তি পাওয়া যায়। এভাবেও সিনেমা বানানো যায়।
নতুনভাবে পানাহি এক ডিক সরি দিকদর্শন দিয়ে গেলেন। যা কোথাও লুকিয়ে থাকা সেই সমস্ত মানুষদের উজ্জীবিত করে গেল যারা নিজেদের ভাষা হারিয়ে ফেলার ভয়ে ছিলেন, তারাও নিজেদের ভাষা রক্ষার নতুন পথের সন্ধান পেলেন।
তাই দিস ইজ নট আ ফিল্ম, দিস ইজ আ ফিল্ম হয়ে দাড়ায়। সমস্ত রঙবেরঙের আদিখ্যেতাকে দুরে সরিয়ে রেখে নতুন এক ভাষার সৃষ্টি করে। যে ভাষায় আবারও কেউ ভেবে উঠে হাতে একটা ক্যামেরা নিয়ে সেও কলমের মত খাতায় প্রতিবাদের অক্ষর লিখে চলবে।। 
ছবিঃ দিস ইজ নট আ ফিল্ম
ধন্যবাদন্তেঃ .....................।
অসংখ্য ধন্যবাদন্তেঃ ............।
উৎসর্গঃ সমস্ত ইরানিয়ান পরিচালকদের।
পরিচালনাঃ জাফর পানাহি
সহযোগিতায়ঃ মোজতাবা মিরতামহ্সব।


সোমবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১২

লাইফ অফ পাইঃ অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম।।





হতাশা আর আশা ভঙ্গের আশা দুটোই কি এক? বেঁচে থাকা আর বাঁচার জন্য লড়াই করা দুটোই কি এক? আমরা হয়ত সবাই একমত হই যে প্রতিনিয়ত আমরা লড়াই করছি বেঁচে থাকার জন্য। হ্যাঁ লড়াই হয়ত করছি কিন্তু কার সাথে লড়াই করছি আর কিসের জন্য করছি? উত্তরটা হয়ত সবারই জানা যে আমরা আমাদের প্রতিনিয়ত জীবনে আগত সমস্যার সাথে চলার পথে বাঁধার সাথে লড়াই করছি কারন যত বেশি সময় আমরা এই পৃথিবীতে থাকতে পারি তার জন্য। আসলে আগেই বলেছি এই লড়াইটা বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু কিসের জন্য বেঁচে থাকা? আমরা সবাই বলি জীবনের জন্য, নিজের জন্য, আমাদের পরিবারের জন্য, আমাদের সমাজের জন্য, আমাদের দেশের জন্য, আমাদের পৃথিবীর জন্য। কিন্তু এ সবের উপরে অস্তিত্বের জন্য। সেই কবে চার্লস ডারউইন বলে গেছেন এ লড়াই আসলে অস্তিত্বের জন্য, তার প্রবন্ধ “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম”। অধুনা হয়ত এই তত্ত্বের সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এ সত্যের বিচ্যুতি হয়নি। পরবর্তীকালে দার্শনিক জঁ পল সাত্রে থেকে শুরু করে কাফকা সবাই এই অস্তিত্বের জন্য লড়াইয়ের কথাই বলে গেছেন। ঐশ্বরিক চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা নিজের জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যখন লড়াই করি আসলে সেটাই তখন অস্তিত্বের জন্য লড়াই করা হয়। ঈশ্বরে বিশ্বাস ভাল, কিন্তু ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। জীবনে বাঁচার পথটা আমাদের নিজেদেরই তৈরি করতে হয় আর নিজেদেরকেই সে পথে হাঁটতে হয়। সমস্যার সম্মুখিন হলে নিজেদেরকেই সেই সমস্যার সমাধান করতে হয়, সমাধান হলে ভাল, না হলে নিজেদেরকেই সেই সমস্যার কবলে পরে পুনরায় সঠিক পথটার জন্য ভাবতে হয় নতুন ভাবে আবার প্রস্তুতি নিতে হয় এগিয়ে যাওয়ার। যদি সঠিক ভাবে আমরা ভাবি তাহলে আমাদের নিজেদের নিজস্ব কোন পরিচয় নেই, নামটাও বাবা মায়ের দেওয়া, তাহলে নিজের পরিচয় কি? উত্তর হয়ত অনেক আসবে কিন্তু সর্বোপরি এটাই সত্য প্রতিনিয়ত আমরা নিজের নিজস্বতাকে পাওয়ার লক্ষ্যেই, নিজের অস্তিত্বকে প্রমানের লক্ষ্যেই লড়াই করে চলেছি। এই লড়াইতে কখন ঈশ্বরের উপস্থিতি আমাদের সবল করে তোলে, আশা জাগায় সমগ্র ক্ষমতার অধিকারী আমাদের সাথে আছেন, আবার কখনও পরাজয়ের গ্লানি আমাদের তার কাছ থেকে বিরত রাখে। তর্ক হয়ত অনেক হবে কেন আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী হব আর কেনই বা হব না। কেন তার ওপর আস্থা রাখব আর কেনই বা আস্থা রাখব না। কিন্তু এ অবসর তর্কের নয় এ অবসর পিস্কিন মলিতর প্যাটেলের জীবন আলচনা করার।
সেই ছোটবেলায় পন্ডিচেরির নীল সাদা জীবনে যখন সারা ক্লাস জুড়ে বোর্ডের পর বোর্ড জুড়ে ৩.১৪৫..... এর পরবর্তী সংখ্যা গুলো লিখে চলেছে তখনই তো সবাই আশ্চর্য অবাক বিস্ময়ে এই “মিরাকেল বয়” এর দিকে তাকিয়ে ছিল। আর এই থেকেই তো তার নামের উৎপত্তি “পাই”। আসলে সে যে সংখ্যা গুলো লিখে চলেছে তা আসলে গাণিতিক এক রাশির সাঙ্খ্যেতিক মান। কিন্তু এ যে আসলে তার সহপাঠীদের তাকে অপমানের উত্তর ছিল।
ছোটবেলা থেকেই তার ওপর ঐশ্বরিক চিন্তাভাবনার প্রভাব পড়ে। সে চার্চে যায়, ফাদারের কাছে জানতে যায় কেন প্রভু যীশু শেষ জীবনে অমন কষ্ট করেছেন, অথচ নিজে বাড়িতে রোজ সকালে নামাজ পড়ে। অস্কারজয়ী পরচালক অ্যাং লি হয়ত এটাই বলতে চেয়েছেন যে ঈশ্বর এক ও অবিনশ্বর ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে বিভক্ত করা যায় না। আমি বিশ্বাস যীশুতে রাখতে পারি কিংবা আল্লায়, আমি বিশ্বাস কৃষ্ণে রাখতে পারি কিংবা বুদ্ধে সেটা নিতান্ত ব্যাক্তিগত কিন্তু আমাদের এক ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত। সে ক্ষমতা হয়ত ঈশ্বর। আসলে এক ক্ষমতা বর্তমান কিন্তু তার বিভক্ততা মানুষের সৃষ্টি। তাই বিপদে পড়লে আমরা তার সম্মুখীন হই, এই তিনিই কখনও আল্লা হন, কখনও বা যীশু। কিন্তু পাই সে তো “গড” কে ডাকে। যেহেতু ইংরাজি ভাষায় ছবি তাই হয়ত গড, ছবি অন্য ভাষায় হলে সেটাও পরিবর্তন হয়ে যেত। কারন সেই ছোটবেলা থেকেই তো পাই এক ও অবিনশ্বর ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এসেছে। পরিচালক তো এটাই আমাদের বলতে চেয়েছেন।
ছবি এগিয়ে চলে প্রথমে প্রাপ্তবয়স্ক পাই যে নিজে তার গল্প বলা শুরু করে এখন সে ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়। আর এই ছোটবেলাই কিছুক্ষন আগে তার সাথে পরিচয় হয় রিচার্ড পার্কারের। রিচার্ড পার্কার কে সে? কেমন তিনি? আর কিভাবেই বা পাই এর সাথে তার বন্ধুত্ব হল? ছবির সমস্ত মজাটা এখানেই। না হলে এটাও সেই আর পাঁচটা হলিউডের ঝিঞ্চ্যাক রঙচঙে অ্যাকশনে মাতোয়ারা বেঁচে থাকার গল্প হয়ে যেত। ইয়ান মরটালের কাল্পনিক উপন্যাসের সার্থকতা এখানেই। যে উপন্যাস পড়ে রিচার্ড পার্কারকে কল্পনা করা একটু মুশকিল হয়ে পড়েছিল, অ্যাং লি সেই কল্পনাকেই দৃঢ় করতে এই উপন্যাসকে পর্দার উপস্থিত করেছেন। বলা বাহুল্য পাতার রিচার্ড পার্কারকে পর্দায় নিয়ে এসেছেন।
ছোটবেলায় রিচার্ড পার্কারের সাথে প্রথমবার দেখাও এক মজার, আসলে সাধারন মানুষ যা কল্পনাতেও ভাবতে পারে না সেটাই যদি কেউ বাস্তবে করতে যায় তাহলেই সাধারনের চোখে সেটা যেমন মজার হয়ে ওঠে তেমনি বড় বিস্ময়েরও হয়ে ওঠে, যেমন আমার হয়েছিল। আসলে এই রিচার্ড পার্কার একজন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। মানুষ ও প্রাণীর মধ্যেও যে অন্তরাত্মা ঘটিত একটা সম্পর্ক আছে সেটাই ধীরে ধীরে ছবি যত এগিয়েছে তত পরিস্ফুত হয়েছে।


দেশান্তরের সময় যখন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে তাদের জাহাজ প্রচণ্ড ঝড়ের সম্মুখীন, প্রবল বাতাস আর জলরাশির ঝাপটা যখন জাহাজ কে তোলপাড় করে চলেছে সেই সময়ই এই প্রাকৃতিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে জাহাজ যখন নিম্নমুখী পতনের দিকে এগিয়ে চলেছে, ছোট একটি লাইফ বোটে তখন নিজের জীবনের প্রদীপখানি জ্বালিয়ে পাই অজানার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে আর তার চোখের সামনে তার পরিবারের তার বাবার সাধের পশুপাখির সলিল সমাধি ঘটছে। রাতের প্রলয়ের তাণ্ডব, স্বজন হারানোর জ্বালা, আর কোন এক অজানার উদ্দেশ্যে রওনা, সেখানে আদও কি জীবনের আলো অপেক্ষা করেছে কিনা কেউ জানে না। তাই পাই এর এই সমস্যাসংকুল সময়ে সে যেন যে পথের উদ্দেশ্যে জীবন মৃত্যুকে উপেক্ষা করে রওনা দিচ্ছে এ যেন তার নিজের অস্তিত্ব প্রমানের নতুন লক্ষ্য। যে নিজে হাতে বাঘকে মাংস খাওয়াতে যায় এই ভেবে যে পশুদেরও মানসিক আত্মবুদ্ধি থাকে যা দিয়ে তারাও মানুষের মত ভাবতে পারে চিন্তাশক্তি দ্বারা নিজেকে চালনা করতে পারে, তার তো বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই উপলব্ধি আরও গভীর হবেই। তাই তো সে সমুদ্র বক্ষে যখন একা একা নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাঠি হাতে রিচার্ড পার্কারকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
একটা জেব্রা, একটা শিম্পাঞ্জি একটা শিয়াল আর একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। সাথে বছর কুড়ির এক বালক পাই। যে সবেমাত্র তার সদ্য প্রস্ফুটিত হওয়া ভালোবাসার কমলকে বিদায় জানিয়েও পুনরায় ফিরে আসার অঙ্গীকার নিয়ে বিদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। কিন্তু অতল সাগরে সব কিছুর সমাধি হওয়ার পর সে এই চার প্রাণীকে কে নিয়ে জীবনের আশা যখন দিগ্বিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই সময় ক্ষুদার তাড়নাও সকলকে তারিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই তো তাকে একে একে সবাইকে হারাতে হয় সাধের অরেঞ্জ কিংকেও। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য যায়গায়। আমরা জানি যে পশু মাত্রই তাদের চিন্তাশক্তি শূন্য। ক্ষুদার জ্বালায় যখন একে একে সবাই নিজের প্রান দিল একমাত্র বোটে সঙ্গী দুজন পাই আর রিচার্ড পার্কার, সেই সময় বাধ্য হয়েই পাইকে কাচা মাংস খেতে হয়, কিন্তু রিচার্ড পার্কার যার দিনে কমপক্ষে ৫ কেজি মাংস লাগে সে সামান্য গুটি কয় উড়ুক্কু মাছ খেয়েই শান্ত থাকল, একবারের জন্যও পাইকে আক্রমণ করলো না? কেন? এর উত্তর বোধহয় আমাদের কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। যারা এই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয় তারাই শ্রেষ্ট হয়ে থাকে যুগে যুগে আমরা এদের উদাহরন দিয়েই মানুষ হওয়ার কথা বলি মানুষের মতন ভাববার কথা বলি, আর যারা পারে না তারা সংখ্যায় অনেক হলেও প্রকৃত মানুষ হিসাবে বিবেচিত হয় না। আসলে সবটাই আমাদের মনের ব্যাপার, মন যা মানতে বলে আমরা তাই মানি, তাই করি, মনও যে আসলে মগজের অংশ, হৃদয় তো মগজেই থাকে। তাই সবকিছু একটু বিচার বিবেচনা করে করলে হয়ত পৃথিবীটা আজকের দিনে এসে এত অশান্ত হত না। আজকে যখন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কই তিক্ততার গভীরে প্রবেশ করেছে, তখন একটা প্রাণীর সাথেও যে হৃদয় ঘটিত সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, এটাই ছিল ছবির মূল মন্ত্র, যা আসলে ছিল অতি সূক্ষ ভাবে তথাকথিত সামাজিক প্রাণীদের ব্যঙ্গ করা। এই সামাজিক প্রাণীরা কারা সেটা আর বলার মুল্য রাখে না। কারন আমি যখন দুটো মাতৃহারা বিড়াল শাবককে প্রয়োজনীয় সেবা না করার ফলে তাদের মৃত্যুতে নিজেকে দণ্ড দেওয়ার কথা বলেছিলাম তখন আমার চারপাশের সামাজিক প্রাণীরা দাঁত কেলিয়েছিল।
সারা ছবি জুড়ে কিছু অসাধরন মুহূর্ত আছে যা সত্যিই ছেড়ে দেওয়া মানে এক অসম্ভব দৃশ্য সুন্দর মাধ্যম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা। আমার আফসোস এখানেই পকেটে জুড়ে গড়ের মাঠের দরুন খুব সামান্য মুল্যের টিকিটের বিনিময়ে আমাকে এই ছবি ঘাড় উঁচু করে দ্বিমাত্রিক মাধ্যমেই দেখতে হয়। এবারও অন্ধকারে চোখে রঙিন চশমা পড়ার সুযোগ হল না। তাই বলাই বাহুল্য সে অভিজ্ঞতা কেমন হবে সে আমি বলতে পারব না। কিন্তু ছবির প্রথম ১০ মিনিট দেখে যখন বারবার মনে হচ্ছিল আমি এক অসম্ভব সুন্দর অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হোলাম এবং বাড়ি ফিরে এসে যখন জানলাম এই ছবির প্রথম ১০ মিনিটের অংশ নাকি ত্রিমাত্রিক ছবির অন্যতম সেরা অংশ, আর হবে নাই বা কেন জেমস ক্যামারুন নিজে ছিলেন এ দায়িত্বে, প্রতিটা ফ্রেমকে আলাদা আলাদা করে ত্রিমাত্রিক আকার দেওয়া হয়েছে, তখন আর আফসোস করারও ইচ্ছে রইল না। আপনাদের সেই অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করার জন্যই এত গুলো কথা লিখলাম এই যাত্রায়।
ভারত এই ছবির পটভূমিকা হওয়ায় ছবির কিছু অংশের চিত্রগ্রহন যেমন ভারতে হয়েছে, তেমনি ছবিতে মূল চরিত্রে বেশ কিছু ভারতীয় অভিনেতা অভিনেত্রীই    অভিনয় করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ছবির সঙ্গীত। মূলত দক্ষিন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাবহার ছবিকে দু ঘণ্টা আট মিনিটের জন্য স্বল্প পরিসরে আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেল এক অজ্ঞাত স্বর, শব্দ আর সঙ্গীত দিয়ে এক গোপন আস্তানায় যেখানে মন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। আর সে বিদ্যুতে বারবার ফিরে এসেও শক লাগে। তাই চলে যাওয়া আসলে যে ভেঙে যাওয়া নয়, মনের কাছাকাছি আজীবন থেকে যাওয়া, সমস্ত আঘাত দিয়ে, নক্ষত্রের দোষ দিয়েও যে ভালোবাসাকে বাঁধা দেওয়া যায় না, যে ভালোবাসা মানুষের সহিত মানুষের বিবাহের মতন জটিল বন্ধনেও আবদ্ধ হয়েও সরু পাঁচিলের ওপর দাড়িয়ে থরথর করে কাঁপে, আর নীচের অতল খাদের দিকে চেয়ে মাথা ঘোরার ভান করে, সে ভালোবাসা কখনও চিরস্থায়ী হতে পারে না। ভালোবাসা একটা অনুভূতি, সেটা চিরকাল থেকে যায়। তাই তো লেখক কে গল্প বলার শেষে বড় হয়ে যাওয়া পাইয়ের চোখেও অশ্রু এসে ভিড় করে। এটা চিরন্তন, চিরকালের, তাই পাইকে তার ২২৭ দিনের ভেসে থাকার ঘটনা বলতে বলা হলে সে যখন সত্যি কথা বলে তখন তা ছাপার অযোগ্য বলে বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপর যখন গল্পের গরুকে গাছে ওঠাবার মতন সে একটা কাল্পনিক গল্প বলে সেই গল্পের ভিতরেও তার ভালোবাসার চিরন্তন সত্য লুকিয়ে থাকে।
পরিশেষে এটাই বলার বাকি থেকে যায় যে জীবন চলবে জীবনের মতনই কিন্তু তাকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব নেওয়া মানেই নিজের অস্তিত্বকে প্রমানের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া। আমাদের সবার জীবনেই অকস্মাৎ এমন ঘটনা ঘটে যায় যা আমাদের দিকে বাড়তি দায়িত্ব এগিয়ে দেয়। কিন্তু সেই ঘটনার অপেক্ষায় না থেকে নিজ বুদ্ধিতে নিজের চিন্তাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আগে থেকেই যদি আমরা সেই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি তাহলে শস্য শ্যামলা সুন্দর পৃথিবীর বুকে আবারও মানুষের বিজয় পতাকা পতপত করে উড়বে। তখন আর রিচার্ড পার্কারকে দিয়ে আমাদের নীতিশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
ধন্যবাদ রিচার্ড পার্কার আজকের এই মোমবাতির মিছিলেও অতি অল্প আলোয় আরও একবার আমাদের সঠিক পথের হদিস দেওয়ায়, ধন্যবাদ অ্যাং লি, ধন্যবাদ ইয়ান মর্টাল।। 

ছবিঃ লাইফ অফ পাই
অভিনয়ঃ সুরজ শর্মা, ইরফান খান, তাব্বু, আদিল হোসেন প্রমুখ।
 চিত্রনাত্যঃ ডেভিড ম্যাগি
সঙ্গিতঃ মাইকেল 
পরিচালনাঃ অ্যাং লি।