রবিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৩

এক নিষ্পাপ ভালোবাসার প্রচলিত গল্প।

ও ক্যাহেতে হ্যে না প্যার মে কুছ সেহি গলত নেহি হোতে।।


বর্ষার বৃষ্টি বড় দীর্ঘ সময় ধরে চলে। জানলার বাইরে তবুও চোখ মেলে তাকিয়ে থাকলে বিরক্ত হওয়ার উপায় নেই। এ যেন কোন এক বুদ্ধিমতি গৃহবধূ যে তার সমগ্রটা দিয়ে সকলকে আগলে রেখেছেন। কোন উপায় নেই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার। প্রায়ই এখন দেরি হয় ফিরতে। রাত হয়ে যায় অনেক। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেও রাত করে ফিরি। কেন ফিরি মাঝে মাঝে নিজেও জানিনা। হয়ত কোন এক ভালোবাসার টানে বা ফেলে আসা দিন গুলোকে একবার রাতের অন্ধকারে ফিরে দেখবার আশায়। আসলে ও ক্যাহেতে হ্যায় না প্যার মে কুছ সেহি গলত নেহি হতে।

অগত্যা হিসেব করতে বসে পড়লাম কি সেহি আর কি গলত, কুনদনের সাথে। বেনারসের গলিতে গলিতে ভগবান থাকেন। সেই জন্যই তো বলা হয় সিটি অফ গড। গঙ্গার তীরে দশাশ্বমেধ ঘাটে ভোলেনাথের কৃপায় তাই আবার কুনদন কোন এক জোয়ার প্রেমে পড়ে যাবে। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে এটাই ছিল কুনদনের শেষ শব্দ কটা। যে হয়ে যেতে পারত আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির নতুন মুখ, কিন্তু দিল্লির ময়দান ছেড়ে হাসপাতালের বিছানায় মুখ থেকে রক্ত বার করে চিরতরে বিদায় নেয়। আসলে ঐ যে প্রথমেই বলে এলাম প্যার মে কুছ সেহি গলত নেহি হতে।

অনেকদিন বাদে বেনারস এল ছবির পর্দায় একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে। অনেকদিন আবারও একটা প্রেমের গল্প, ত্রিকোণ প্রেমের গল্প। অনেকদিন বাদে গলায় গামছা জড়ানো পায় চপ্পল পড়া, বেশী পড়াশুনো না জানা প্রেমে পাগল এক যুবকের গল্প। ঠিক যেন আমার ছোটবেলায় দেখা আমার দুচারজন বন্ধুর কথা যারা প্রেম নিবেদন করতে গিয়ে গালে হাত দিয়ে ফিরে এসেছিল। আর ছোটবেলার প্রেম, তাদের কালো মেম সেই ছোটবেলায়ই হারিয়ে গিয়েছিল। কজন কুনদনের মতন ৮ বছর অপেক্ষা করেছিল তা আজ বলতে পারব না।



আমার বজবজ লোকাল স্পিড বাড়ায়, বাইরে বৃষ্টি তখনও গুড়ি গুড়ি পড়ছে। ভাবছি বাড়িতে ফোন করব কিনা, ভাবতে ভাবতেই ওপাশের জানলার সামনে বসে থাকা ছেলে মেয়েটার দিকে চোখ যায়, ছেলেটার হাতে মেয়েটার হাত দুজনে গভীর কথায় মগ্ন। ভালোবাসার কথা। হয়ত আবার বহুদিন পড়ে ওদের দেখা হবে। খুব ইচ্ছে করছিল জানতে ওরা কি হিন্দু দুজনেই না একজন হিন্দু একজন মুসলিম। জোয়া, কুনদন কেউই জানত না তাদের প্রেম পরিনিতি পাওয়ার সামনে ধর্মটা যাজক হয়ে দাড়াবে। তাই প্রেম গড়ে ওঠার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানত এই মেয়ে আবারও এক হিন্দু ছেলের প্রেমে পড়বে আর বাড়িতে মিথ্যে বলে তাকে বিবাহ করবার ইচ্ছে প্রকাশ করবে। পর্দায় আমরা প্রথমবারের জন্য দেখব এক মুসলিম নারীর প্রেমে পাগল দুই হিন্দু যুবক।

বেনারস পার করে আমরা ঢুকে পড়ি জে এন ইউ এর ক্যাম্পাসে। সেখানে অগোচরে কখনও চে আমাদের পাশে থাকেন কখনও বা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের পোস্টার। আমরা একদল নতুন প্রজন্মকে দেখি একটা নতুন স্বপ্নকে দেখি। একটা নতুন দলকে দেখি। সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মগ্ন একদল নতুন যুবক- যুবতিকে দেখি। যারা স্বপ্ন দেখে একটা নতুন সমাজ গড়ার। যেখানে নব প্রজন্ম এগিয়ে আসবে, হাতে হাত রেখে সমাজের জঞ্জাল পরিষ্কার করবে। এটাই তো আশা। কিন্তু এসবের মাঝেও বড় প্রশ্ন ওঠে মনে যে যারা সমাজকে পরিষ্কার করে নতুন প্রজন্মের কাছে উপহার দেবে ভাবছে তারাও তো সৎ পথে থাকে না, পরীক্ষার হল থেকে রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়েও নৈতিক দায়িত্বটা পালন করে না। কিন্তু তা স্বত্বেও যশরাজের গালে প্রেমের স্পর্শ লাগে। আর আমার কপালে একটা হাসি জোটে যখন আমি বলি নিজে যা পারি তাই দিয়েই যদি পাশ করতে পারি তো করব না হলে নাইবা হল।

বজবজ লোকাল অর্ধেকটা পথ চলে আসে। কেমন একটা ঝিমুনি লাগছে, বাতাসের শীতল স্পর্শে যেন গায়ে কাটা লাগছে। বুঝিনা মনে হয় জ্বর আসবে হয়ত। আর মনে পড়ে কুনদন আবার দ্বিতীয়বার সেই একই প্রেমিকার কাছে অস্বীকার যোগ্য হয়ে ওঠে। আর আবার সেই হাত কেটে হাঁসপাতালে। কিন্তু প্রেম যে একটা এমন অনুভুতি যার জন্য অনেক সময় নিজের কাছেও হেরে যেতে হয়, আর সেই হারার মধ্যেই যেন একটা আনন্দ থাকে। আসলে সেই মানুষটার জন্য হারা জেতা তো দূরের কথা জীবন গেলেও যাক। কুনদন তো শেষে গিয়ে এটাই প্রমান করতে চেয়েছে। এদিকে জানলা দিয়ে আরও জোড়ে হাওয়া এসে লাগছে বজবজ লোকাল আরও গতি বাড়াতে থাকে। আর ঐদিকে কুনদন চলেছে তার প্রেমিকার নিজের প্রেম কে সামাজিক মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্যে।

এরপর এক লড়াই শুরু হয়, চরম লড়াই। সব ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি দেওয়া, নিজের প্রেমিকাকে তার প্রেমের হাতে তুলে দেওয়ার লড়াই। কিন্তু সেখানেও ব্যর্থতা। পরিস্থিতি যেন সব কেড়ে নেয়। ঐ যে বলে ভালোবাসার পরীক্ষা। কেউ তাতে পাশ করে কেউ বা এড়িয়ে চলে। দিল্লির জে এন ইউ এর ক্যাম্পাস এরপর কুনদন বন্দনায় গান গায়। প্রচার সর্বস্বতায় কুনদন এক আইকনিক মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু এসব তারই জন্য যে একদিন তার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিল। ভালোবাসা কোন বাঁধা মানে না, ভালোবাসা কারও রাগ-অভিমানের তোয়াক্কা করে না। না হলে কি করে পেরেছিল সেদিন সিতা দাদার মুখের ওপর বলে আসতে সে অভিরূপের সাথে গরীবের সংসার ধর্ম করবে।

কেউ কাউকে কতটা ভালবাসলে তাকে মৃত্যুর দুয়ারে ছেড়ে আসতে পারে। কুনদন হয়ত শেষ শয্যায় শুয়ে এটাই ভেবেছিল। যা আমরা কেউ শুনতে পাইনি। একটা প্রেম যে সবসময় তার হতে চেয়েছিল আর একটা প্রেম যা সে চেয়েছিল তা কোনদিন তার হতে চাইনি। তাই তাকে মৃত্যু শয্যায় শুয়ে স্মৃতি রোমান্থনের মাধ্যমে ভাবতে হয়, একটা প্রেম, একটা বন্ধু বা নিজের বাবা আজ থেকে যাবে। হয়ত আবার কোন জোয়ার প্রেমে পড়ে এভাবেই নিজের জীবন দিয়ে তার ভালোবাসাকে রক্ষা করে যাবে কোন এক কুনদন। আজও সে বেনারসের গলিতে ছুটে বেরাচ্ছে আর যেই মুহূর্তে জোয়ার দেখা পাবে তারও মনে হবে “ নামাজ মে ও থি পর এইসা লাগা কে দুয়া মেরি পুরি হো রেহি হ্যায়”।

আমার বজবজ লোকাল গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে যায়। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে সাথে ঝোড়ো হাওয়া। আমি পকেট হাতরাই, মোবাইল খুঁজতে থাকি, মনে হয় এই বুঝি কোন মেসেজ এল সেদিনের মত, যে ঝড় উঠবে হয়ত, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাও। মোবাইলের আলো জ্বলে, তবে না আজ আর কোন মেসেজ আসেনি। আমি বাড়ির পথে পা বাড়াই ঝোড়ো বৃষ্টি নিয়ে, আর ভাবতে থাকি হয়ত একটু পড়েই মেসেজটা আসবে, বাড়ি ফিরেছ? ঝড় উঠেছে যে। আসলে সেই যে এক বিশ্বাস প্যার মে সেহি গলত কুছ নেহি হোতে। ভালোবাসা অবিনশ্বর। এর কোন সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। শুধুমাত্র তা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের দিকে এগিয়ে যায়। তাই সেকালের হির-রাঞ্ঝা আজকের কুনদন-জোয়ার মধ্যেও নতুন ভাবে থেকে যায় রাঞ্ঝানাতে।  

ছবিঃ রাঞ্ঝানা।
অভিনয়ঃ ধানুস, সোনম কাপুর, অভয় দেওয়াল প্রমুখ।
সঙ্গীতঃ এ.আর রহমান
পরিচালনাঃ আনন্দ.এল.রাই

শনিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৩


“প্রেম তো সঞ্চয়”
তবুও
কেন লুঠ হয়?
 

“প্রেম তো সঞ্চয়” যেদিন একটু একটু করে জমানো সোহাগ চুরি হয়ে যায় মেনে নিতে কষ্ট হয় একাকীত্ব, তারপর ভালোবাসার সমান্তরালে জমে ওঠে অভিমান , যে অভিমান বলে “ফিরে এলেও আর ফিরিয়ে নেবো না”। আসলে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যায়না “প্রেম” নামক আমানত যে তালা বন্ধ হৃদ কোঠরে আছে সেই চাবি।




কেন লুঠ হয়? “কেন একবার অন্তত ‘মন’ রাখার জন্য বলতে পারনা যে আমি তোমাকে ভালবাসি” অনেকদিন পর হিন্দি ছবির পর্দা জুড়ে প্রেম আলপনা তৈরি করে নিজের মত করে। “লুটেরা” সদ্য স্বাধীন একটা দেশে জমিদার কন্যা আর এক ঠগ ছেলের রূপ কথার মত প্রেমের / না প্রেম নামক ফাঁদের কথা বলে? কিন্তু এগল্প তো প্রথমবার বলা হচ্ছে এমন তো নয় তবে কিসের এতো আবেশ?




বাংলাদেশের মানিকপুরের জমিদারের বিরাট রাজত্ব আর আদরের কন্যা ‘পাখি’ নিয়ে ভীষণ সুখের দিন এর মাঝে বরুন শ্রীবাস্তব এর আগমন , পেশাগত ভাবে যে ‘প্রত্নতত্ববিদ’ । এক মিষ্টি গাড়ি দুর্ঘটনাটতে প্রথমবার দু চোখের দৃষ্টি বিনিময় আর নিস্তব্দতার মাঝে হাল্কা সুরে বেজে চলা আবহসঙ্গীত ফিস ফিস করে আমাদের কানে বলে প্রেম আসছে প্রস্তুত হও। ‘পাখি’ বড় হয়ে লিখতে চাই, বরুন এর দ্বারা খনন কাজ ছাড়া আর কিছু হয় না। এমত অবস্থাতে তাদের আড্ডা বা প্রেম জমানো একমাত্র পথ হয়ে ওঠে “ছবি আঁকার ক্লাস”। কিন্তু সে ক্লাস জুড়ে আমরা ছবির পরিচালক আর চিত্রগ্রাহকের মুন্সিয়ানাতে দারুন সুন্দর বাংলার রূপ দেখি। ছবি যত এগোতে থাকে জমিদারের ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক শক্তি কমতে থাকে। হঠাৎ  ছন্দ পতন হয়, বরুন জমিদারের মন্দিরের দেবতার সোনার মুর্তি ও “পাখির” মন চুরি করে পালিয়ে যায়। প্রেমের ছবিতে এতক্ষণ যে “ভালোবাসা” একটু একটু করে জমা হয়েছিলো , যে ভালোবাসা আগের দিন রাতে পাখিকে সবথেকে বেশি সুখে রাখতে চেয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিল সেই ভালোবাসা চুরি হয়। বরুন শ্রীবাস্তব , পাখির প্রেম আসলে সমান্তরাল পথ ঘুরে “লুটেরা”। সিনেমা সেকেন্ড স্পেস এ প্রবেশ করে। এখান থেকে কেন যেন কিছুটা সময় ব্যক্তিগত ভাবে আমার আর ছবিটাকে ভালো লাগে না  । মনে হয় “ফানাহ”র মত বড্ড চেনা ছকে চলছে ছবিটা। ধীরে ধীরে সেরকম ঘোটতে থাকে । ডালহৌসি নামক কোনও এক পাহাড়ি শহরে সে এখন একা থাকে, তার বাবা গত হয়েছেন, ‘পাখি’ এখন লেখে । এই রকম  পটভূমি আবার সেই ভালোবাসা  ফেরত আসে মুখমুখি দাড়ায় ঘেন্নার , অপছন্দের। তবুও প্রেম সুগন্ধি হয়ে রয়ে যায় ছবির সঙ্গীতে ।




কোথাও গিয়ে পরিচালক কি বানিজ্যের কথা ভেবে ছবির যে সেকেন্ড স্পেস তৈরি হয়েছিলো সেই পথকে অস্বীকার করে কেন পাখিকে অসুস্থ করেন? কেন এতো দ্রুত বরুনকে এর দ্বিতীয়বার পাখির কাছে ফিরে আসতে হয়? কেন বরফ শহর? কেন গুলিবিদ্ধ হয়ে বরুন আশ্রয় খোঁজে ? এই চেনা পথ তো অতিপরিচিত “ফানাহ” সিনেমার দ্বিতীয়ভাগের মত সব মশলাদার রসদে থাসা। ও হেনরির “দ্যা লাস্ট লিফ” অবলম্বনে এ  ছবি নির্মিত হয়েছে কিন্তু অন্য পথে হাটার সব উপাদান তো পরিচালক নিজে হাতে তৈরি করেছিলেন। যদি এমন হত যে বরুন অন্য কোথাও স্থির, পাখির লেখা বই তার কাছে পৌঁছল কোনও একদিন। যদি দুটো সমান্তরাল গল্প একসাথে চলত একে ওপরের অভিমুখে যেমন ভাবে পাখি তার অতীত ভালোবাসার স্মৃতিচারনা করে শেষের দিন গুনছিল , সেই দিনগুলো কি হতে পারতোনা পাখির লেখা বইয়ের এক একটা পাতা। তারপর না হয় আবার দৃষ্টি বিনিময় আবার অভিমান আবার প্রেমজ্বর। আবার রূপকধর্মীগাছটির এক একটা করে পাতা গুনে জীবনের অবশিষ্ট দিন গোনা। এটুকু সাহস কিন্তু দেখানো যেতো। কারন ছবির সঙ্গীত ও আবহ সঙ্গীত তো ততক্ষণ দর্শককে প্রেমে ডুবিয়ে রেখেছে।  


সম্ভবনার বাইরে ছবিটি কিন্তু একটু হলেও মনে করিয়ে দেয় আমাদের একান্ত ব্যাক্তিগত ভালো লাগার কথাগুলো এমন অনেক লুটেরা আজও তো আছে যারা রূপকথা দিয়ে চিঠি লেখে, যে রূপ কথার একটা চরিত্র তুমি আর একটা ............। তারপর একদিন শীতের ময়দান বা বৃষ্টির প্রিন্সেপ ঘাটে অন্য কারো হাত ধরে ভো কাট্টা বা প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করা গালেটোল পড়া বা না পড়া মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে দুটো যারা এপর্যন্ত একবারও লুটেরা হতে চেষ্টা করল না। বা সেই ‘২০১৩’ র পাখি যে ঘুম জড়ানো ভোরে এসএমএস লিখতে থাকে “হ্যাঁ বলিস আর না বলিস এই বৃষ্টি ভেজা দিনে আমি তোর প্রেমে পড়েই গেলাম , একটা কদম গাছ দেখে রাখ দুজনে ...............” । আমার খুব একটা ভালো না লাগা ছবির দ্বিতীয় ভাগটা জুড়ে না হয় এ সব মানুষের ভালো লাগা থাক।    



পরিচালকঃ বিক্রমাদিত্য মাতয়েন।
দৃশ্যগ্রহণঃ মহেন্দ্র জে
সুর ও আবহসঙ্গিতঃ অমিত ত্রিবেদী।
                                                        লেখাঃ মৌন।
 



কৃতজ্ঞতা ঃ  সুরঙ্গমা
 






রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৩


ঋত্বিক ঘটককে লেখা এক খোলা চিঠি-



কী বলে সম্বোধন করব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আসলে চিঠি লেখার অভ্যেস আমাদের কোনোকালেই ছিল না। আমরা হলাম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর প্রজন্ম। আমদের দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্ত। আর ভনিতা না করে আপনাকে কাজের কথা বলি।



আচ্ছা, আপনার অহল্যাকে মনে আছে নিশ্চয়। সেই কাকদ্বীপের মেয়েটি যাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল, আর কাকদ্বীপ হয়ে উঠেছিল মুক্তাঞ্চল। আপনিও তো কেঁদেছিলেন সেই সময়, পাগলের মতো স্বপ্নে, মৃতদেহ নিয়ে ছুটেছিলেন প্রতিকারের আশায়। জানেন সে তো অনেক বছর হল তখন এক অহল্যার জন্য আপনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। আজ থাকলে কি করতেন? আপনি বোধহয় লজ্জায় আত্মহত্যাই করতেন। জানিনা ঠিক কী করতেন। আজ রোজ একটা করে ধর্ষণ হয় ঋত্বিকবাবু। আর তারপর তাকে টুঁটি টিপে মেরে ফেলা হয়। পরিবারের লোক কান্নায় হতাশায় ভেঙে পড়েন, আমরা খবরের কাগজে পড়ে আবার মুড়িয়ে সেটাকে যথাস্থানে রেখে দি, আর সরকারি আমলারা পরিবারের লোকেদের চাকরি দেবার কথা বলে। সেই স্কুলে থাকতে ধনঞ্জয়য়ের ফাঁসি হয়েছিল দেখেছিলাম, তারপর আর তেমন কিছু শুনিনি। অথচ দিল্লির দামিনী, পার্ক ষ্ট্রীটের মেয়েটি, বারাসাতের নাম না জানা অনেকে, কাল কামদুনি, আজ গাইঘাটা, একের পর এক হয়ে চলেছে। আপনার মতো নারীকে আজ আর কেউ দেবী রূপে দেখেনা। নারী আজ প্রয়োজনীয় চাহিদার ভোগ্যপণ্য। অথচ একটু ভেবে দেখেলে বোঝা যায় যে নারীর মায়াতেই আমরা পুরুষেরা বেঁচে আছি। থাক আর বেশী কিছু বলে কি হবে যা হচ্ছে হয়ে যাবে, এইভাবেই চলবে যতই চেল্লামেল্লি হোক। মানুষের পাশে দাড়িয়ে সহযোগিতা করা মানুষ আজ ভুলে গেছে। মানুষের জন্য কেউ কিছু করতে চায় না। আপনার মতো কেউ পিপলস আর্টিস্ট নেই সবাই এখন শেল্ফ আর্টিস্ট।



এই প্রসঙ্গে আসি আপনাকে নিয়ে একটা ছবি বেরিয়েছে আপনার ছবির নামাকরনেই “মেঘে ঢাকা তারা”। পরিচালক কমলেস্বর মুখোপাধ্যায়। জীবিত কালে তো কিছুই পেলেন না। মৃত্যুর এতদিন পর না হয় ভালোবাসার অনুপ্রদান। ছবিতো কেউ দেখেনি আপনার, আপনার লেখাতেই পড়েছি, কেউ বোঝেনি আপনার ছবি। আর দেখুন এখন আপনাকে দেখার জন্য কী তোড়জোড়। বাঙালির আঁতলামোটা মূল্যবৃদ্ধির মতো দিনের পর দিন বাড়ছে। শুনেছিলাম আপনি নেশাগ্রস্থ ছিলেন কিন্তু মাইরি বলছি ছবিটা না দেখলে সত্যিই জানতে পারতাম না আপনি এই হারে বাংলা টানতে পারেন। আর সাথে বিড়ি। সিগারেট পর্যন্ত খেতেন না, এত অভাব ছিল, সরকারি টাকায় তো শুনেছিলাম বেশ কিছু তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন, গাড়িও কিনেছিলেন পড়েছিলাম, কিন্তু এখানে যে দেখলাম আপনার সংসারের দৈন্য দশা। খেতেও পারেন না ঠিক ভাবে। কিজানি বাপু ঠিক বুঝতে পারিনা। প্রথম জীবনে তো গণনাট্য করতেন তারপর ছবিতে এলেন তো আর তাছাড়া আপনি তো বিখ্যাত ঘটক পরিবারের ছেলে ছিলেন, তাহলেও এই দুর্দশা ছিল! ঠিক আছে চলো দুঃখ আমাদের সকলের সঙ্গী আছে থাকুক।

চলুন এবারে আপনাকে ছবির কথাটা বলি। যেহেতু ছবির বিষয়বস্তু আপনি, কিন্তু আপনার জীবনী নিয়ে ছবি নয়। শুধুমাত্র সেই সময়টা নিয়ে যখন আপনি পাগলাগারদে আর বদ্ধ উন্মাদদের নিয়ে নাটক করার কথা ভাবছেন। আপনার এই সময়ে বারেবারে আপনি ফিরে গেছেন আপনার অতীত জীবনে কীভাবে আপনি এলেন এই পাগলাগারদে। সোজা কথা উন্মাদ ছিলেন তাই এলেন। কিন্তু উন্মাদ হলেন কেন। শিল্পী তো, ক্ষ্যাপা তো হবেনই, ক্ষ্যাপামো ছাড়া কি শিল্পটা হয়? কিন্তু ছবিতে দেখি আপনার শিল্পকর্ম ছাড়া আর বাকি সবকিছু। শিল্প করার ঔদাসিন্যতা ছাড়া বাকি সব কিছু থাকে। আপনার ভাবনা চিন্তা, নাটকের প্রতি ভাবধারা, সমাজ সংস্কারক হিসাবে নিজেকে মেলে ধরা। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনাকে খুঁজে পাইনা। যে ঋত্বিক বলতে পারে আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনি, সিনেমাকে নিজের হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার করি সেই ঋত্বিক নেই ছবিতে।



আমরা তো সবাই জানি আপনি মেনে নিতে পারেন না ৪০ লক্ষ মানুষের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেশভাগ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দ। যে বাংলাকে ভাঙলো ওরা, আপনি তা মেনে নেননি। আপনার কথা মতো আজও আমরা বলি বাংলার আবার এপার ওপার কী। কিন্তু বিশ্বাস করুন আজকে ২০১৩ তে এসে এসব নিয়ে কেউ ভাবে না। কর্পোরেট দুনিয়ার জমকালো জীবনধারণ, মোটা মানিব্যাগের কচকচানিতে বড় জোর সময় কাটাতে যাওয়া যেতে পারে আপনাকে দেখতে। কিন্তু যারা আপনাকে চেনে না তারা কেউ যাবে না। কোন বাল বাংলা খেয়ে মাতলামো করত, বয়ে গেল তাঁকে দেখতে যেতে। কিন্তু বিষয়টা অন্য। আপনার ছবিতে যে দেশভাগের যন্ত্রণা আমাদের আবেগকে অনুভূতিতে সঞ্চারিত করে, সেই আবেগ কমলেস্বর বাবুর ছবিতে ফুটে ওঠে না। খাপছাড়া ভাবে আসে আপনার ছবির অংশবিশেষ। যা আমরা বহুকাল ধরে দেখে আসছি। নতুন ভাবে দৃশ্যত এই অংশ আমার আবেগকে ছোঁয় না।



বেশ করেছিলেন পাগলামো করেছিলেন, যে সময় চলছিল তখন আপনার মতন মানুষ আজকের বাঞ্চতদের মতো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারত না। একের একের পর এক কিশোরকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামে গুলি করে খুন করা হচ্ছিল আর কিছু মানুষ এসবের ফায়দা লুটে নিজেদের আখের গোচ্ছাচ্ছিল। কে বলেছিল গান্ডুদের বিদ্রোহে করতে? কী হয়েছিল এর ফলে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ ছেড়ে সমাজ বদলাবার দায় নিয়েছিল। বাল ছিঁড়েছিল। আত্মবলিদান কেউ মনে রাখেনি, আর রাখবেও না। ওরা ঐ নকশালই রয়ে গেল। তাই আজকের দিনে এসে বিনায়ক সেনের হাজতবাস বা কিসেনজীর মৃত্যু রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয় হয়ে যায়। আপনার কথাই ঠিক রাষ্ট্র থাকলে রাষ্ট্র দ্রোহিতাও থাকবে। কিন্তু কি জানেন ছবিতে এই আত্ম বলিদানের পিরিয়ডটা কেমন যেন নিঃসার। কোন আগুনের ঝলকানো নেই। বিদ্রোহে ফুঁসে ওঠা নেই, সময়কে ডাক দিয়ে সময় বদলানোর বাসনা। শুধু গুলি করে মৃত্যু দেখি আর দেখি অজ্ঞাতবাসরে আপনিও কীভাবে মিশে যান ওদের সাথে। আজ আমরা স্ট্যাটিস্টিক মেলাই, গত বছরের তুলনায় কজন বেশী ধর্ষণ হোল আর কটা মাওবাদী মারা গেল। আর দেখি আমাদের রাজ্য এবারে এসবের বিচারে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। আজ বলতে ভয় লাগে “কটা বাঙালি আপ দেখা হ্যায়।” সব বাঙালিই হয় কর্পোরেট ঢ্যামনা, নয় ধর্ষণকারী বাঞ্চত। আর আমরা হলাম তৃতীয় শ্রেণী, দুটোর কোনটাই সাপোর্ট করি না, শুধু মুখ বুজে সহ্য করে যাই। একটু বেশি পদক্ষেপ নিলেই আবার রাষ্ট্রের চোখ রাঙানি।





আপনাকে কেন্দ্র করে আপনার চারপাশের সব চরিত্ররা সবাই ছিলেন, কিন্তু তারা ঐ চরিত্রই রয়ে গেলেন, চরিত্রের বাইরে এসে রক্তমাংসের আসল মানুষটা হতে পারলেননা। নতুন আর কিছু বলার নেই জানেন, পয়সা পেয়েছিলেন তাই সেট, আর্ট, ক্যামেরা এসব তো ভালো হবেই। কিন্তু এসবকে আলাদা ভাবে চেনা যায়। একটা সেট চরিত্রদের থেকে বেরিয়ে এসে নিজে একটা চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না। একটা দৃশ্যের আর্ট ডিরেকসন আমায় কোন সময়ের কথা মনে করায় না। কেমন মোনোটোনাস। আর সঙ্গীত, মুহূর্তে আবেগ সৃষ্টি করে না, রাগে বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটায় না। বেজে চলে শুধু দৃশ্য থেকে দৃশ্যের পর। লোক সঙ্গীতের ব্যাবহারও, শুধুমাত্র ব্যাবহার করার জন্যই থেকে গেল। মানুষের জীবন দর্শন হয়ে উঠল না তা।



আর কী বলি বলুন তো। সময়টা কেমন স্থির হয়ে আছে। মেঘ করেছে বুঝতে। এই বুঝি বৃষ্টি নামবে। নামুক, কিছু এসে যাবে না তাতে। আর কেউ স্পর্ধা দেখানোর সাহস করবে না। আমরা গুটিয়ে যাব ধীরে ধীরে। আপনি থাকুন যেখানে আছেন যেমন। তবে আপনাকে মনে করিয়ে দিই এই হাড়হাভাতে সময় যখন বাংলা ছবি বলতেই মানুষ কোমর দুলিয়ে বিদেশি নাচের কথা ভাবত এমন একটা সময়ে কমলেস্বরবাবু একটু অন্য ভেবেছেন তাই তাঁকে কুর্ণিশ।



আমরা কেউ উদ্বাস্তু দেখেনি ঋত্বিক বাবু। এপারে জন্মেছি। শুনেছি, পড়েছি সেই সময়ের কথা, কেমনভাবে মানুষ ঘরছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিল সর্বস্বান্ত হয়ে। সেই সময়ের বেদনা যেভাবে আপনার ছবিতে উঠে এসেছিল, এবারে আপনি পর্দায় উপস্থিত থেকেও সেই বেদনাকে স্পর্শ করাতে পারলেন না আমায়। আমরা আপনার ভূমিকায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের ভালো অভিনয় দেখি, আমরা আপনাকে নির্মাণের ভূমিকায় কমলেস্বর মুখোপাধ্যায়ের ছবি দেখি, কিন্তু সারা ছবি জুড়ে আপনাকে দেখি না। দেখি না সেই মানুষটাকে যে সগর্বে বলতে পারে “সিনেমার জগতটা আদ্যোপান্ত শুয়োরের বাচ্চায় ভরে গেছে”।মাফ করবেন আপনার থেকে খানিকটা স্পর্ধা রপ্ত হয়েছে, তাই সামান্য জ্ঞানের ঝুলি নিয়ে এর চেয়ে ভালো ভাষায় আর লিখতে পারলাম না। যাই হোক ভালো থাকবেন। প্রণাম নেবেন।





                                                  ইতি



      অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়া, সমঝোতা করতে না পারা এক বঞ্চিত বাঞ্চত।


লেখাঃ আদিত্য।
ছবিঃ ওয়েব।